হাজার বছরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধারন করে আছে বাংলার তাঁতশিল্প। এক সময়ে হাতে চালানো তাঁতেই বোনা হতো বিশ্বসমাদৃত মসলিন, জামদানি। আজও তাঁতশিল্পীদের দক্ষ হাতের কারুকাজে তৈরি সোনারগাওয়েঁর ঐতিহাসিক জামদানি, রাজশাহীর সিল্ক, টাঙ্গাইলের শাড়ি, কুমিল্লার খাদি, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি-গামছা, ঢাকার মিরপুরের বেনারসি সমান জনপ্রিয়। তবে কালের খেয়ায় তাঁতশিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও সেই মহাজনি কারবার আর দাদনের ফাঁদ থেকে আজও বেরুতে পারেনি শিল্পীরা। নানা সংকটের মুখে অনেকে পেশাও ছেড়েছেন। এর ওপর গত দুই বছরের করোনা মহামারির ভয়াবহতা তাঁতশিল্পে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিশেষ করে দেশের মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা টাঙ্গাইলের তাঁতে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।
মূলত, টাঙ্গাইলের অর্থনীতিকে অনেকটাই চাঙা রাখে জেলার তাঁতশিল্প। এখানকার তৈরি তাঁতের শাড়ির দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। আর এই রপ্তানি আয়ের ওপর ভর করে জেলার বড় এক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা চলে। আর তাঁতনির্ভর অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছেন তাঁত পেশায় জড়িতরা। সুঁতার চরকি ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে যাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে। অথচ গত দুই বছর ধরে করোনা আর ওমিক্রনের ধাক্কায় নিস্তব্ধ হয়ে যায় টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী। বন্ধ হয়ে যায় জেলার প্রায় ৬০ ভাগ হস্তচালিত তাঁত। বেকার হয়ে পড়েন শিল্পীরা। যাদের অনেকে আবার বদল ঘটান পেশার।
তবে গত বছরের শেষের দিকে করোনা পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে এলে তাঁতপল্লী আবারো জেগে ওঠে। ঘুরতে শুরু করে চরকির চাকা। প্রয়োজন পড়ে কারিগরদের। তবে শিল্পীরা পেশা বদলে ফেলায় তাঁতপল্লীতে দেখা দেয় কারিগর সংকট। আর এই সংকট মোকাবিলায় শাড়ি বানানোর কারিগর আনা হয় পাবনা আর সিরাজগঞ্জ থেকে। এমনিতেই গেল কয়েক বছর ধরে দফায় দফায় সুতার দাম বাড়ার কারণে নাজুক হয়ে পড়ে তাঁতশিল্প। তার ওপর কারিগর সংকট দেখা দেয়।
কারিগররা বলছেন, করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন তাঁত বন্ধ থাকায় আয় রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যায়। এর ওপর আবার শাড়ির দামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্রমিকের মজুরি না পাওয়ায় পেশা বদল করতে হয়েছে। এখন ঈদকে সামনে রেখে রমজানে শাড়ির চাহিদা বাড়লেও কারিগর কম থাকায় উৎপাদন বাড়ছে না। ফলে চাহিদা মেটাতে পারছে না তাঁতপল্লী।
এদিকে, তাঁতপল্লী সরেজমিন ঘুরে জানা গেল তাঁতশিল্পের আরেক জটিল সমীকরণ। মূলত, বেশিরভাগ তাঁতশিল্পীরই নেই নিজস্ব তাঁত। তারা মহাজনদের বাড়িতে স্থাপন করা তাঁতেই শাড়ি বোনেন। সপ্তাহ শেষ শাড়ি উৎপাদন অনুযায়ী মজুরি পেয়ে থাকেন। শাড়ির লাভ-লোকসান কিংবা বাজারের দায়-দায়িত্বে নেই তারা। অন্যদিকে, মহাজনেরা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে সুতাসহ সব কাঁচামাল দাদনের মাধ্যমে কিনে শাড়ি তৈরির জন্য কারিগর নিয়োগ করেন।
এক্ষেত্রে অবশ্য মহজনদের শাড়ি বেচার কোনো সুযোগ থাকে না। বরং তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে পাইকাররা উৎপাদিত শাড়ি পৌঁছে দেন বিক্রেতাদের হাতে। আবার কারিগরদের কাজ তদারকির জন্য দ্বিতীয় পক্ষ পারিশ্রমিক পেয়ে থাকে। এভাবে কয়েক দফায় হাতবদল আর সুবিধাভোগের কারণে বেড়ে যেতে থাকে শাড়ির দাম।
তাঁতশিল্পী বা কারিগরদের অভিযোগ, রমজানে শাড়ির দাম যেমন বেড়েছে তেমনি চাহিদাও বেড়েছে। অথচ কারিগরদের মজুরি কোনোভাবেই বাড়ানো হয়নি। করোনাকালে শাড়ি বিক্রি না হওয়ায় মজুরি কমানো হয়। তবে বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে শাড়ির দাম বেড়ে গেলেও কারিগরদের মজুরি বাড়েনি। এক্ষেত্রে উৎপাদনকারী (কারিগর), মহাজন (তদারকি) এবং মধ্যস্বত্বভোগী পাইকারি বিক্রেতাদের মধ্যে লাভের অসম বণ্টনের ফলে বঞ্চিত কারিগর তথা শ্রমিকরা পেশা বদল করেছেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা সুফল পেলেও বরাবরের মতোই বঞ্চিত হচ্ছেন তৃণমূলের কারিগররা।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে টাঙ্গালেই তাঁতশিল্প তার নিজস্ব ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও হস্তচালিত তাঁতের পরিবর্তে পাওয়ারলুম বা বৈদ্যুতিক তাঁত চলে এসেছে। বৈদ্যুতিক তাঁতে উৎপাদিত শাড়ির গুনগত মান কখনই হস্তচালিত তাঁতে উৎপাদিত শাড়ির মানের সমান হবে না বলে মনে করেন স্বয়ং তাঁতশিল্পিরাই। শাড়ি ব্যবহারকারীদেরও এমনটাই ধারণা।
স্থানীয়দের ঘাটতি থাকায় সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে টাঙ্গাইল তাঁতপল্লীতে এসেছেন কারিগর বাছেদ আলী শেখ। তিনি সপ্তাহে তিনটি করে শাড়ি তৈরি করছেন। মহামারির আগে প্রতি শাড়িতে মজুরি পেতেন ১২০০ টাকা। করোনায় মজুরি কমিয়ে দেয়া হতো ৮০০ টাকা। বর্তমানে ঈদের ভরা মৌসুমে শাড়ির চাহিদা আর মুনাফা বেড়ে গেলেও কারিগরদের মজুরি ৮শ’ টাকাতেই আটকে থাকছে। থাকা খাওয়ার খরচ বাদে যা থাকে তা দিয়ে সংসার চালানোর খরচ পাঠাতে কষ্ট হয়ে যায় বাছেদ আলীর।
পাবনার বেড়া থেকে আসা কারিগর রনি বললেন, অন্য কাজ শিখিনি বলেই এখনও তাঁতের কাজ করছি। তবে এ কাজ করে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। একই রকম অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন পাবনার বেড়া থেকে আসা রাহেলও। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে আসা শাহাদত আর রবিউল মোল্লার অভিযোগ, শাড়ির বাজার ভালো। উৎপাদনও ভালো। অথচ শাড়ি বিক্রি করতে না পারার কথা বলে তাদের মজুরি বাড়াচ্ছেন না মহাজনেরা। পাবনা, সিরাজগঞ্জ থেকে আসা কারিগররা এভাবে মজুরি বঞ্চনার শিকার হয়ে পেশাই বদলে ফেলার পরিকল্পনা করছেন। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চললে তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখা কষ্টকরা হয়ে পড়বে।
তবে কারিগরদের অভিযোগ খণ্ডণ করে রাম রাজবংশী নামে তাঁতশিল্পের মহাজন বা মালিকপক্ষের একজন ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, দফায় দফায় সুঁতাসহ কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো যাচ্ছে না। করোনার পর প্রতি কাটিম জরি ৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা, ৫ হাজার টাকার রেশম সাড়ে সাত হাজার টাকা, ৬০ টাকার রেয়ন ১০০ টাকা। এভাবে সব কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলেও শাড়ির দাম সে হারে না বাড়ায় মজুরি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
তাঁতপল্লীর বাসিন্দারা বলছেন, যখন তাঁতিরা নিজেদের উৎপাদিত শাড়ি নিজেরাই টাঙ্গাইলের বাজিতপুর ও করোটিয়ার শাড়ি হাটে বিক্রি করতেন তখন তারা দাম পেতেন। ব্যবসাও ভালো ছিল। তবে এখন শাড়ির লাভ কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদনকারী কারিগররাই সঠিক মজুরি পাচ্ছে না। এ কারণেই এখন হুমকির মুখে পড়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাঁতশিল্পের অর্থনৈতিক চাকা সচল করতে হলে তৃণমূলের কারিগরদের সচল করতে হবে। এজন্য কম সুদে ঋণ দিয়ে ঘরে ঘরে তাঁত স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদিত শাড়ির বাজার তৈরি করতে হবে। যেন সহজে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেয়া যায় শাড়ি।
টাঙ্গাইল তাঁতপল্লীর শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক দৈনিক আনন্দবাজরকে বলেন, করোনাকালে বেশিরভাগ তাঁত বন্ধ ছিল। ঈদকে ঘিরে সচল হয়েছে তাঁতপল্লী। ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। উৎপাদিত শাড়ি দেশের বিভিন্ন জেলাতে পাইকারি বিক্রি করেছি। খুচরা বিক্রেতারা শাড়িগুলো ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে পারলে আমরা সঠিক সময়ে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাবো। তাদের বিক্রির ওপর আমাদের লাভ লোকসান নির্ভর করছে।
এদিকে, সুঁতাসহ কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় শাড়ি উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়ে যাচ্ছে সে হারে শাড়ির দাম বাড়ছে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্টপোষকতা জরুরি বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।









