গরমকাল এলেই বেড়ে যায় হাতপাখার চাহিদা। দিন দিন গরম বেড়ে যাওয়ায় হাতপাখার চাহিদা আগের চেয়ে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেশি গরমে যখন লোডশেডিং হয় তখন ঘরে ঘরে হাতপাখার খোঁজ পড়ে যায়। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে গেছে। যে কারণে হাতপাখার চাহিদাও বেড়েছে বেশ। আর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হাতপাখার শিল্পীরাও তুমুল ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে। হাতপাখার চাহিদা বাড়ার চিত্র দেখা গেছে গাইবান্ধার সাদুল্ল্যাপুরে হাতপাখার গ্রামখ্যাত বুজরুক ও রসুলপুর খামারপাড়া গ্রামে। হাতপাখার কারিগররা জানাচ্ছেন বর্তমানে চাহিদা বেড়েছে।
তবে এই হাতপাখা বাণিজ্যের হাত ধরেই সচ্ছলতা এসেছে সাদুল্ল্যাপুরের জামালপুর ইউনিয়নের বুজরুক ও রসুলপুর খামারপাড়ার তিন শতাধিক পরিবারে। গ্রাম দুটি গত এক দশক ধরে খ্যাতি পেয়েছে হাতপাখার গ্রাম হিসেবে। গ্রামে গিয়ে চোখে পড়ে চেনা দৃশ্য। কেউ বাড়ির উঠানে সুতা গোছাচ্ছেন, কেউ বা করছেন বাশঁকাটার কাজ, আবার কেউ বা ব্যস্ত পাখা বুননে। বাড়ির কাজ শেষে অবসর সময়ে এসব হাতের কাজ করে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতায় অবদান রাখছেন দুই গ্রামের বহু নারী। শুধু অবদানই নয়, অনেকে পরিবারের অর্থিক অবস্থা বদলে দিয়ে হয়েছেন স্বাবলম্বী। পরিবারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মতামত দেয়ার জন্যই স্বীকৃতি পাচ্ছেন নারীরা।
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে সোজা ২৪ কিলোমিটার দূরে বুজরুক ও রসুলপুর খামারপাড়া গ্রাম। দুই গ্রামের তিনশোর বেশি পরিবারে বাশেঁর চাকের ভেতরে বিভিন্ন রঙের সুতো দিয়ে তৈরি হচ্ছে আকর্ষণীয় হাতপাখা। রান্নাবান্না আর বাড়ির অন্যান্য গৃহস্থালী কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে চলছে হাতপাখার তৈরির কাজ। বাড়ির আঙিনায় বিশ্রামের সময় গল্প করতে করতেও চলছে হাতপাখা তৈরির কাজ। কর্মহীন অলস সময় না কাটিয়ে এখন নারীরা যখনই সময় পাচ্ছেন তখনই বসে পড়ছেন কাজে। দশ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। সকালে গৃহস্থালির এক দফা কাজ শেষে আঙিনায় বসেই শুরু হয় কাজ। এরপর দিনভর চলে রঙিন সুতোয় পাখা তৈরির টানা কাজ।
গ্রামের পুরুষরা কৃষিসহ অন্যান্য পেশায় যুক্ত থাকলেও তারাই মূলত করে দিচ্ছেন পাখার হাতল, ডাটি, চাক তৈরিসহ বাঁশের কাজ। আর পাখা তৈরির মূল বা শেষ কাজটি করছেন নারীরা। গ্রাম ঢুকলেই চোখে পড়ে গাছের নিচে, পুকুরপাড়ে কিংবা খোলা জায়গায় কয়েকজন মিলে একসঙ্গে বসে গেছেন সুই-সুতো আর চাক নিয়ে।
গ্রামের বধূ সোমেনা, হাসিনা, মাজেদাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তবুও তারা নিজে নিজে কাজ করতে করতেই দক্ষ হয়ে উঠেছেন। তাদের দেখে দেখে ছোটরাও শিখছেন সেসব কাজ। স্কুল পড়ুয়ারাও ছুটি শেষে বাড়ি ফিরে সহায়তা করছে বড়দের। হাতপাখার কারিগর সোমেনা বেগম বলেন, চৈত্র থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পাখার বেচাকেনা চলে। দুই গ্রামের প্রায় ছয়শ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার জড়িয়ে আছে পাখা বুননের সঙ্গে। এসব পরিবারের নারীরা প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার পাখা তৈরি করছেন। পাখা তৈরির পর কেউ কেউ গ্রামে বিক্রি করেন, আবার কেউ পাইকারের হাতে তুলে দেন। এ দুই গ্রামের পাখা গাইবান্ধা ছাড়িয়ে চলে যায় জামালপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।
গৃহবধু মাজেদা খাতুন বলেন, তার স্বামী মাহের আলম শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি আগে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। সেসময় আয় উপার্জন কম হওয়ায় প্রায়ই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লেগে থাকতো। বছর দশেক আগে তিনি হাতপাখা তৈরি শুরু করেন। পরে তার হাতে টাকা পয়সা আসতে থাকে। ঝগড়াঝাটিও কমে আসে। সেই হাতপাখার আয় দিয়েই এক ছেলেকে উত্তরের প্রবেশদ্বার খ্যাত বগুড়া শহরে রেখে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতি হিসেবে গয়না গড়ছেন, কিছু আবাদি জমিও নিয়েছেন। আর অন্য বাড়িতে কাজে যেতে হয়না। হাতপাখা বিক্রি থেকে উপর্জিত আয় দিয়ে দুটি টিনের ঘর তুলেছেন। অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি ছেড়ে তার স্বামী এখন পাখার ব্যবসা ধরেছে। স্বামী আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তার এখন ভালো চলছে সংসার।
হাতপাখার কারিগর হাসিনা বেগম জানান, সংসারে সচ্ছলতা আনতে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি পাখা বোনেন তিনি। পাশের উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ থেকে ৩শ টাকা কেজিতে আনতে হয় সুতা। এখন অবশ্য মোবাইল ফোনে চাহিদা জানালে সুতা বাড়িতেই পৌঁছে দেয় দোকানিরা। এক কেজি সুতা দিয়ে ৩০-৩৫ টি পাখা বানানো যায়। প্রতিটি মোড়ানোর কাপড় ও পারিশ্রমিকসহ প্রায় ২৫ টাকা খরচ হয়।
মরিয়ম বিবি জানান, শীতকালে তিন মাস পাখা তৈরির কাজ বন্ধ থাকে। ওই তিন মাস সুতো, বাঁশ, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে মজুদ রাখা হয়। বছরের প্রায় বাকি ৯ মাসই চলে পাখা তৈরির কাজ। বিশেষ করে এই গরমের সময়টা পাখার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাজের চাপও বাড়ে। তিনি বলেন, পাখা তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে গেছে। অন্যদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয়। তারপর পাখা বিক্রি হলে সেই ঋণ সুদে আসলে শোধ করতে হয়। যদি আমাদের কুটিরশিল্প হিসেবে সরকারি ভাবে ঋণ সহায়তা পাওয়া যেত তা হইলে হাতপাখা তৈরি শিল্পটি বাড়ানো যেতো
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) গাইবান্ধার সহকারী মহাব্যবস্থাপক রবীণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, হাতপাখা তৈরি ও বাজারজাতকরণে বিপণন ব্যবস্থা তৈরিসহ প্রশিক্ষণ ও সহজে ঋণ সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
আনন্দবাজার/শহক









