- প্রতিদিন ৫০ কোটি টাকা লেনদেন
- কম দামে দুধ বেচতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা
- হিমায়িত দুধ সংরক্ষণে সরকারি চিলিং পয়েন্ট স্থাপন জরুরি
বগুড়ায় গবাদি পশুর খামার বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন উদ্যোক্তাদের। জেলাতে দিন দিন গো-খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত বেকার যুবকরা অল্প পুঁজিতে খামার গড়ে খুঁজে পাচ্ছেন স্বপ্নের ঠিকানা। সেই সঙ্গে দেশীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে খাতটি। তবে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গো-খাদ্যের দাম বাড়াতে অনেকটায় বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। তবে, সরকারিভাবে তদারকির পাশাপাশি সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে প্রাণিসম্পদ বিভাগও দেশের জিডিপিতে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখেতে পারবে।
দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে নিরাপদ পুষ্টিযুক্ত খাবারের চাহিদা। আর এ পুষ্টিযুক্ত খাবারের বেশীর ভাগই আসে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে। দেশে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য বগুড়া জেলায় প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে প্রায় ৪৬ হাজার গবাদি পশুর খামার। এ খামারগুলোর মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু মোটাতাজাকরণ এবং দুগ্ধ খামার।
এছাড়া ছাগল ভেড়ার খামার রয়েছে ৫০টির মত। এ সকল খামার থেকে উৎপাদিত মাংস জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। চলতি বছরে জুন মাসে কোরবানি উপলক্ষে জেলাতে গরু, ছাগলের চাহিদা ছিল ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩শ’ টি। সেখানে গরু ছাগল প্রস্তুত ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার ২৯৫টি। উদ্বৃত্ত গোবাদি পশু ছিল ৬৭ হাজার ৯শ টির মত। একইভাবে দুধের চাহিদা থেকে প্রায় প্রতিদিন ৩ লাখ লিটার দুধ বেশী উৎপাদন হয়। যা বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যের কারখানাগুলো কিনে নেয়।
রাকিবুল হাসান, বগুড়া শহরের টিনপট্টি এলাকার বাসিন্দা। ইংল্যান্ডের নিউ ক্যাসেল কেলে ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় স্নাতকোত্তর করেছেন। এরপর দেশে ফিরে বাবার রড সিমেন্ট ব্যবসার হাল ধরেন। শখের বসে শহরের প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে বানদিঘি এলাকায় পৈত্রিক জমিতে গড়ে তোলেন গরুর খামার। স্কুলের এক বড় ভাই বিপ্লবের খামার দেখে খামার করার পরিকল্পনা নেন। ২০১৯ সালে শুরু করা এ খামারটিতে প্রথমে মোটাতাজাকরণের জন্য ১০টি গরু তোলেন। পরবর্তীতে তার খামারে গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গত কোরবানির সময়ে তিনি ৫০টি গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করেছেন। এতে খরচ বাদে প্রায় ২০ লাখ টাকা লাভ হয়েছে তার।
চলতি বছরের শুরুর দিকে রাকিব খামারটিতে দুধের জন্য কিছু গাভী তোলেন। বর্তমানে ৬টি গাভী রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় একশ লিটার দুধ দিচ্ছে গাভীগুলো। উৎপাদিত দুধ পাস্তরিত প্যাকেটজাত করে প্রতিদিন ৬০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। তার মতে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কখনো লোকসান গুনেননি। লাভ হয়েছে ভালোই। নতুন করে যারা খামারে উদ্যোগী হাতে চান তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রথমে ছোট আকারে খামার তৈরী করুণ। অবস্থা বিবেচনা করে খামারের পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ সফল এ খামারির।
এদিকে খামারে লাভ দেখে জেলায় শিক্ষত যুবকদের মধ্যে অনেকে খামার করতে উদ্যোগী হচ্ছেন। সারিয়াকান্দির হাট শেরপুর গ্রামের জাবেদ আলী বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেন। বসে না থেকে ২০২১ সালে ৩টি গরু নিয়ে খামার শুরু করেন। তিনি উপজেলার মধ্যে সকরের অনুকরণীয় একটি খামার গড়ে তুলতে চান।
বগুড়া জেলা দই এর জন্য প্রসিদ্ধ। এরমধ্যে শেরপুর উপজেলার দই এবং মিষ্টি মিষ্টান্ন দেশখ্যাত। আর এ দই এবং মিষ্টি ও মিষ্টান্ন তৈরীর প্রধান অনুসঙ্গ দুধ। শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, শুধুমাত্র শেরপুর উপজেলায় গবাদি পশুর খামার রয়েছে ২০ হাজার। এরমধ্যে গাভীর খামার রয়েছে ৬ হাজার। প্রতিদিন এ খামারগুলো থেকে উৎপাদন হয় প্রায় দেড় লাখ লিটার দুধ। উৎপাদিত দুধ দিয়ে দই এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন তৈরী করে থাকেন কারিগররা। শুধুমাত্র শেরপুর উপজেলায় দুগ্ধজাত উৎপন্ন পণ্যের কারখানা রয়েছে ৪ হাজারের মত। এসব কারখানায় দুধ দিয়ে প্রতিদিন যেসব খাদ্যপণ্য তৈরী হয় সেসব পণ্যের বাজার প্রায় ১২ কোটি টাকা। এসব দুগ্ধজাত খাদ্য জেলার গন্ডি পেড়িয়ে রাজধানীসহ অন্য জেলায় বিক্রি হচ্ছে। প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে এসব কারখানায় জড়িত রয়েছেন ৫০ হাজার শ্রমিক।
শেরপুর উপজেলায় দিনে দেড় লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হলেও এখানে কোনো স্থায়ী বাজার নেই। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত অস্থায়ী হাট বসে শেরপুর পৌরপার্ক চত্বরে। এখানে যারা দুধ বিক্রি করতে আসেন তাদের অনেকে গরমে আবার বার্ষায় ভিজে দুধ বিক্রি করতে হয়। তাই দুধ ক্রেতা এবং বিক্রেতার দাবি উপজেলায় একটি স্থায়ী দুধের বাজার স্থাপন করা।
শালপা এলাকার দুধ বিক্রেতা আবু হান্নান জানান, তাদের প্রধান সমস্যা দুধের দাম নিয়ে। কখনো পানির দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হন আবার কখনো সঠিক দামই পান। যখন দুধ বিক্রির জন্য ক্রেতা পাওয়া যায় না তখন সরকারিভাবে যদি দুধ সংরক্ষণ করা যেত তাহলে তারা লোকসানের হাত থেকে রেহাই পেতেন। এ জন্য তাদের দাবি সরকারিভাবে চিলিং পয়েন্ট স্থাপন। যাতে করে হিমায়িত করে দুধ সংরক্ষণ করা যায়।
গবাদি পশুর খামারকে কেন্দ্র করে বগুড়ায় ঘাস চাষ এখন বাণিজ্যিক রুপ লাভ করেছে। শেরপুর, সারিয়াকান্দি, সদর উপজেলাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় প্রতিদিনই অস্থায়ীভাবে ঘাসের বাজার বসেছে। অনেকে জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ঘাস চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য বলছে, প্রতিদিন জেলায় ৬০ লাখ টাকার ঘাস কেনাবেচা হয়। আর শুধুমাত্র শেরপুর উপজেলায় ঘাসের বাজার রয়েছে প্রতিদিন ৯ লাখ টাকা।
শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রায়হান (পিএএ) আনন্দবাজার প্রতিবেদককে বলনে, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের চাহিদাপূরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান তৈরীর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভীত মজবুত করার লক্ষ্যে বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসকে মডেল হিসেবে দাঁড় করে সারাদেশে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উন্নয়ন কাজ চলছে। যাতে করে দেশীয়ভাবে আমিষের চাহিদাপূরণ করে রপ্তানিমুখী হওয়া যায়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সাইফুল ইসলাম জানান, জেলার ১২টি উপজেলায় প্রতিদিন এ খাতে অর্থাৎ দুধ, মাংস, গো-খাদ্য এবং দুধ থেকে বানানো খাদ্যের বাজার প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এ খাতকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এবং খামারবান্ধব করে সবকিছুতে সেবা দেওয়া গেলে গবাদি পশুর খামার দেশীয় অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রাখতে পারবে। ইতিমধ্যে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রতিটি উপজেলায় গবাদি পশুর চিকিৎসায় ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালসহ খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। স্বল্পসুদে যাতে ঋণ পায় সেদিকে সহযোগিতা করছে। অদূর ভবিষ্যৎতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ দেশে আরও অনেক অবদান রাখতে পারবে।









