ঢাকা বিভাগের মুন্সিগঞ্জ জেলা, রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, খুলনার যশোর ও রাজশাহীর বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিলেটের হবিগঞ্জে আলুর উৎপাদন বেশি হয়ে থাকে। তবে উৎপাদন বেশি হলেও মুন্সিগঞ্জে খুচরা বাজারে আলুর দাম বেশি। এখানকার কৃষক পর্যায়ে ৮ বা ১০ টাকা কেজি হলেও খুচরা বাজারে ২০ টাকা কেজি।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি এমনকি দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় মুন্সিগঞ্জ জেলায়। তবে দাম কোন অংশেই কম নয় এখানে। মুন্সিগঞ্জ জেলায় ৫০ শতাংশ মানুষই আলু চাষের সাথে যুক্ত। জেলাটির শ্রীনগর উপজেলার আরিফুল ইসলাম শ্যামল জানান, এখন মূলত আগাম জাতের আলু বাজারে উঠছে। কৃষক পর্যায়ে এটি ৮ থেকে ১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা পর্যায়ে ২০ টাকা করে। তিনি জানান, জেলাটির প্রধান ফসলই আলু।
রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে আলু উৎপাদন হয় জয়পুরহাট জেলায়। সেখানকার আলু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়াসহ বিশ্বের ১১টি দেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। জেলাটিতে ১৮ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হয় আলু বলে জানান সাখাওয়াত হোসেন বিপু। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গ্রানোলা, মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টোরিকস, কার্ডিনাল ও রোজেটা জাতের আলু চাষ হয়।
রাজশাহীর ইলিয়াস আরাফাত জানান, রাজশাহীতে ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় আলু। রংপুর বিভাগের মো. রেজাউল করিম মানিক জানান, রংপুরে আলুর উৎপাদন বেশি হলেও এখানে দাম প্রচুর। গড়ে ২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় আলু। বরিশালের হাসিবুল ইসলাম জানান, এখানে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে আলু। সিলেট বিভাগীয় শহরে আলুর দাম ১৫ টাকা কেজি। এখানকার বাসিন্দা হাসিবুল হক ডালিম জানান, সিলেটে আলুর উৎপাদন তেমন একটা হয় না। হবিগঞ্জ জেলা থেকে বিভাগীয় শহরে আলুর আমদানি হয়ে থাকে।
চট্টগ্রামের মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিভাগীয় শহরে ২২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় আলু। এদিকে নোয়াখালী জেলার দ্বীপ আজাদ বলেন, জেলাটিতে আলুর উৎপাদন কম। কুমিল্লাসহ অন্যান্য জেলা থেকে এখানে আলু আমদানি হয়ে থাকে। কেজিপ্রতি ৩০ টাকা ব্যয় করতে হয়। খুলনা বিভাগের যশোরে এক কেজি আলু কিনতে ব্যয় হচ্ছে ২৩ টাকা। জেলাটির বাসিন্দা তবিবুর রহমান জানান, খুলনা বিভাগের মাগুরাতে আলু চাষ বেশি হয়ে থাকে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে সাধারণত দেশি প্রজাতির আলুর কদর বেশি। এটির বিক্রি ৩৫ টাকা কেজি। আর হল্যান্ডের নতুন আলু ২৫ টাকা করে বিক্রি হয়। জেলাটির বাসিন্দা রাকিবুল হাসান রুবেল জানান, ময়মনসিংহের মানুষ স্থানীয় আলুই বেশি খায়। তবে হল্যান্ডের আলুর বাজার কোন অংশেই কম নয়। হোটেল বা রেস্তোরাঁগুলো বড় আলুই বেশি খাবার হিসেবে পাওয়া যায়।
কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক গতবছরের নভেম্বরে জানান, দেশে বর্তমানে বছরে এক কোটি টনেরও বেশি আলু উৎপাদিত হয়। বিশ্বে দেশের অবস্থান ষষ্ঠ। স্বাধীনতার এক বছর আগে দেশে আলু উৎপাদন ছিল ৯ লাখ টন। স্বাধীনতার পর ৫০ বছরে আলু উৎপাদন ১১ গুণ বেড়েছে।
মূলত, ১৯৮০ সালে মুন্সিগঞ্জসহ দেশের হাতে গোনা কয়েকটি জেলায় আলুর চাষ শুরু হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা কেন্দ্রের (ইফপ্রি) এক যৌথ গবেষণায় গেছে, ভাতের পর দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য ও খাদ্যশক্তির উৎস হচ্ছে আলু। গত পাঁচ যুগে এর উৎপাদন বেড়েছে ২৬ গুণ। আর মাথাপিছু আলু খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ১০ গুণ। এক যুগে দেশের বিজ্ঞানীরা ৬১টি আলুর জাত উদ্ভাবন করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) আলুর নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে।
ভাজি থেকে তরকারি সবখানেই আলুর ব্যবহার বাড়ছে। প্রতিদিন তরকারিটি বহুল ব্যবহৃত হলেও তাতে অরুচি নেই মানুষের মধ্যে। তরকারি থেকে, চিপস, চানাচুর, রুটি, বিরিয়ানি হতে নানান পদের খাবারে রসনা মিটিয়ে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে আলু। পর্তুগিজদের জাহাজে চড়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসা আলু সতেরো শতকের দিকে চাষ শুরু হয়। যদিও এটি মূলত আমেরিকার স্থানীয় ফসল। তবে আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে এখন দেশের সপ্তম শীর্ষ ফসলে দাঁড়িয়েছে।
গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে এক কোটি ১০ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। দেশের ৩২৫টি হিমাগারে সংরক্ষণের ক্ষমতা আছে মাত্র ২৫ লাখ টন। বাকি ৮৫ লাখ টন আলুই কৃষকের ঘরে সংরক্ষণ করতে হয়। এতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তা ছাড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে আলু রফতানি হচ্ছে। আগামীতে এটি আরো বৃদ্ধি করতে রোডম্যাপ তৈরি করেছে বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়।
প্রথমদিকে আলুর চাষ কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। সেখান থেকে আলুর চাষ যায় চেরাপুঞ্জিতে। ওয়ারেন হেস্টিংসের সময়ে (১৭৭২-১৭৮৫) আলুর চাষ বোম্বেসহ অনেক প্রদেশে বিস্তার লাভ করে। ইংল্যান্ডের দ্যা গার্ডেনিং মান্থলি ম্যাগাজিনে ১৮৪৭ সালের একটি সংখ্যায় ভারতে আলু চাষ সম্পর্কে প্রথম রেকর্ড দেখা যায়। ১৯৯৮ সালে এ্যাগ্রোবেজড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম-এটিডিপি একটি মার্কেটিং মিশন বাংলাদেশ থেকে সিংঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ফ্রেশ আলু রফতানির সম্ভাব্যতা যাচাই করে এবং ১৯৯৯ সালে এটিডিপির উদ্যোগে প্রথম ১২৬ টন আলু উল্লিখিত দেশে রফতানি করা হয়। তারপর থেকে পর্যায়ক্রমে আলু রফতানি চলছে।
তাছাড়া কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়াতে একটি খসড়া রোডম্যাপ তৈরি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, আলু রফতানির ক্ষেত্রে ২০২২ সালের মধ্যে ৮০ হাজার টন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ২০ হাজার টন, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮০ হাজার টন এবং ২০২৫ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার টন রফতানি করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে আলুর উৎপাদন ছিল ৯০ লাখ টন, ২০২১ সালে উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ টন। দেশে আলুর চাহিদা রয়েছে ৮৫-৯০ লাখ টন। উৎপাদিত এ আলুর সর্বোচ্চ ২২-২৫ লাখ টন ৩২৫টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। সে হিসেবে ৮৫ লাখ টন আলু হিমাগারের বাইরে কৃষকের ঘরে থাকে।
মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রজনন বীজ উৎপাদন কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, দেবীগঞ্জ-পঞ্চগড় এর ড. বিমল চন্দ্র কুণ্ড দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে আলু রফতানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের নীতি সহায়তা পেলে এটির রফতানি আরো বাড়বে। ইতোমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক করে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে এটি আশার দিক। এই বিজ্ঞানী বলেন, বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি আলুর উৎপাদন বেড়েছে। আমরা আশাবাদী আগামীতে কৃষকরা ভালো দাম পাবে।
আনন্দবাজার/শহক









