- চাহিদার অজুহাতে দাম বৃদ্ধি
করোনার ভয় কাটতে না কাটতেই উত্তরাঞ্চলে হঠাৎ বাড়তে শুরু করেছে জ্বর, সর্দি-কাঁশির প্রকোপ। অদৃশ্য এ ভাইরাসের উপসর্গ এখন ঘরে ঘরে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে বেড়েই চলেছে রোগীর চাপ, সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রয়োজনীয় ওষুধের চাহিদাও। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু করোনাভাইরাস নয়, ঋতু পরিবর্তনেরও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ কারণে সবখানেই এখন জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেন তারা।
অন্যদিকে ঘরে ঘরে জ¦র, সর্দি-কাঁশির প্রভাব পড়েছে ওষুধপাড়ায়। চাহিদার কারণে নাপা, নাপা এক্সট্রা, এইচ প্লাস, নাপা সিরাপসহ প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে, বেড়েছে দামও। রংপুর অঞ্চলের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এটি কৃত্রিম সংকট নয়, বরং কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সাময়িক এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে ফার্মেসিগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। গত মঙ্গলবার রংপুরে ইকো ল্যাবরেটরিজ ইউনানি ফ্যাক্টরি নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এসময় বৈধ কাগজপত্র না থাকাসহ অনুমোদন ছাড়াই পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের অপরাধে কারখানাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি অ্যান্ড মিডিয়া) সাজ্জাদ হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার বিকেলে নগরীর তাজহাট থানাধীন ইকো ল্যাবরেটরিজ ইউনানি ফ্যাক্টরিতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। অভিযানকালে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস থেকে সরবরাহ করা কোনো ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি। কারখানায় অনুমোদনহীনভাবে কিছুসংখ্যক ওষুধ প্রস্তুত করা ছাড়াও ওষুধ তৈরির কাঁচামাল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি এবং শ্রমিকদের মাস্ক, গ্লোভস, অ্যাপ্রোনসহ স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী ছিল না। এসব অপরাধের দায়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর রংপুরের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তনুকা ভৌমিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এসময় ওই কারখানার মালিক মশিউর রহমান শাহীনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেন। একই সঙ্গে ত্রুটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত কারখানাটির সকল কার্যক্রম ও উৎপাদন বন্ধ রাখার আদেশ দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুরসহ বিভাগের প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলার ফার্মেসিগুলোয় সহজে মিলছে না জ্বর-সর্দি, কাশি-হাঁচির ওষুধ। চাহিদার অজুহাতে দামও বাড়িয়েছেন ফার্মেসির মালিকরা। বিশেষ করে পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিগুলোতে বেশি দামে প্যারাসিটামল বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ মিলছে ফার্মেসি মালিকদের বিরুদ্ধে। ক্রেতাদের অভিযোগ, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় লাভের আশায় ফার্মেসি-মালিকরা এ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছেন।
জ্বরের ওষুধ এইচ প্লাসের জন্য এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসি ঘুরছিলেন নগরীর দর্শনা এলাকার হাসান মিয়া। বেশ কয়েকটি ফার্মেসি ঘুরে ওই ওষুধ খুঁজে পাননি তিনি। নগরীর মেডিকেল মোড় এলাকায় চাহিদাপত্র নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরেও ওষুধ না পাওয়া রুমি বেগম বলেন, ‘সাত বছরের ছেলের জ্বরের জন্য ওষুধ নিতে এসেছিলাম। তবে বড় বড় কয়েকটি ফার্মেসি ঘুরেও পর্যাপ্ত ওষুধ মিলেনি।’ গঙ্গাচড়া বাজারে আল্পনা রিতু নামের একজন অভিযোগ করে বলেন, ‘যদিও দু-একটি ফার্মেসিতে জ্বর-সর্দির ওষুধ মিলছে, কিন্তু চাহিদা থাকায় তারা বেশি দামে বিক্রি করছে। আসলে কোম্পানিগুলোতে ওষুধের সংকট রয়েছে কি না, তা প্রশাসনকে খতিয়ে দেখা উচিত।’
জাহাজ কোম্পানি মোড়ে একটি ওষুধ কোম্পানির স্বত্বাধিকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে জ্বর, সর্দি, কাশির প্রকোপ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। চাহিদার তুলনায় কোম্পানিগুলো আমাদের ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে না। বিশেষ করে নাপা ট্যাবলেট, নাপা সিরাপ, এইচ ট্যাবলেট ও এইচ সিরাপের চাহিদা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে প্রতি পাতা নাপা ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে যার দাম আট টাকা ছিল। এছাড়া অন্যান্য প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের দাম বাড়েনি। নাপা এক্সটেন প্রতি পাতা ১৫ টাকা, জি-ম্যাক্স প্রতি পাতা ১১০, এইচ প্লাস ২৪ টাকা পাতা বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে একটি ওষুধ কোম্পানির রংপুর প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে সবার ঘরে ঘরে জ্বর হওয়ায় উৎপাদনের তুলনায় ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। যে কারণে বাজারে সরবরাহ কমেছে। চলতি মাসের মধ্যে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। রংপুর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তনুকা ভৌমিক জানান, ওষুধ-সংকট সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আবু মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলার বিকল্প নেই। ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।









