
অর্থমূল্য বিবেচনায় দেশে দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানি আয়ের উৎস পাট ও পাটজাত পণ্য। সারাবিশ্বে এখন প্লাস্টিক বা সিনথেটিক ফাইবার বাদ দিয়ে ন্যাচারাল ফাইবার বা প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এসব তন্তু দিয়ে তৈরি বৈচিত্রময় পণ্যের সমাদর বিশ্বব্যাপী যেমন বাড়ছে তেমনি বড় হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার।
দেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশখ্যাত পাটজাত পণ্যের কদর অভ্যন্তরীণ বাজার ছাপিয়ে এখন বিদেশেও ব্যাপক বেড়েছে। একইসঙ্গে বৈচিত্র্যময়, আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের রফতানি আয়ও বাড়ছে। বিশেষ করে পাটের তৈরি টব, খেলনা, জুট ডেনিম, জুয়েলারি, ম্যাটস, জুতা স্যান্ডেল, বাস্কেট, শাড়ি, পাঞ্জাবি ও গৃহস্থালি নানা সরঞ্জামের বৈদেশিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনে গতি ফিরেছে।
পাটের তৈরি সূতা, দড়ি, বস্তা, প্যাকিং সরঞ্জাম, ব্যাগ বা থলে রফতানি হচ্ছে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে। পাটজাত পণ্যের চাহিদা ও বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পের হাত ধরে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাটজাত পণ্যের রফতানি আয়ের আকার ছিল ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের। এর পেছনে প্রধান অবদান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েক লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তার।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এক কোটি ১৩ লাখ মানুষের। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে সরকার ২০২৪ সাল নাগাদ জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক দৃশ্যপটের পেছনে রয়েছে হাজারো ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। যাদের মধ্যে সিংহভাগই রয়েছেন নারী। যারা কুটির শিল্পের মাধ্যমে পাটজাত পণ্যের নতুন ইতিহাস তৈরিতে অবদান রাখছেন।
অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব হিসেবে পাটপণ্যের চাহিদা দিন বেড়ে যাওয়ায় দামও বাড়ছে পাটের। আবার দাম ভালো পাওয়ায় চাষীরাও বেশি করে ঝুঁকছেন পাট চাষে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাট চাষের জমি সম্প্রসারিতও হচ্ছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) বন্ধ মিলগুলো চালু করে পাটপণ্য উৎপাদনে সউদী আরবের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সৌদি আরবের এই আগ্রহ কিছুটা হলেও পাটশিল্পে আশার সঞ্চার করেছে।
পাশাপাশি পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকলগুলোকে বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে আনারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পাঁচটি পাটকল ইজারা দিতে পাঁচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করেছে বিজেএমসি। এসব প্রতিষ্ঠান কারখানার জমি, যন্ত্রপাতি এবং সুবিধাদি কেবলপাত্র পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করতে পারবে। শর্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক ঋণের জন্য পাটকলের সম্পত্তি বন্ধক রাখতে পারবে না।
মূলত, পোশাক শিল্পখাত বিকাশের আগে আশির দশকে সোনালি আঁশ পাট ছিল অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য। তবে সরকারি পাটকলগুলো নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পণ্যে বৈচিত্র আনতে না পারায় দিনে দিনে ব্যবসা হারিয়ে রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর একদিকে লোকসান গুনছে, অন্যদিকে সরকারি পাটকলের বিশাল সম্পদ অব্যবহৃত থাকছে। গেল ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানির পরিমাণ ছিল ১১৬ কোটি ১৪ লাখ ডলার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ডলারের। এ হিসাবে পাটখাতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
দেশে-বিদেশে পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা এ খাতে তাদের শ্রম ও মেধা ঢেলে দিচ্ছেন। এতে উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এক যুগের রেকর্ড ভেঙে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে ১১৬ দশমিক ১৪ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। আগের বছরের তুলনায় গত বছর পাটজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩১ শতাংশ।
মূলত, দেশে যত জমিতে পাট চাষ হয়, তার এক তৃতীয়াংশ হয় বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায়। তবে মন্দার কারণে কৃষকরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু গতবছর থেকে ভালো দাম পাওয়ার কারণে আবার পাটের চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। ফলে দেশে সোনালি আঁশের সুদিন ফিরছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আনন্দবাজার/শহক








