- লাভজনক হওয়ায় দিন দিন জনপ্রিয়
- খরচের তুলনায় লাভ দ্বিগুণ
- চাকরি ছেড়ে পান চাষে আগ্রহ
উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় বেড়েছে পানের চাষ। ধান, আলু, পাট ও সরিষাসহ অন্যান্য ফসলের চেয়ে পান চাষ লাভজনক হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকছেন পান চাষে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত পান যাচ্ছে রংপুর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন স্থানে। প্রয়োজনী সুবিধাসহ ঋণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গাইবান্ধা উৎপাদিত পান রফতানি করে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব বলে মনে করেন সাধারণ কৃষকরা।
পান চাষে রোগবালাই ও ঝুঁকি কম থাকায় স্থানীয় কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ অঞ্চলে পান চাষে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবার উৎপাদিত পান থেকে প্রায় কোটি টাকা আয় হবে বলে জানালেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর, কুপতলা, মালিবাড়ীসহ সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধর্মপুর, কঞ্চিবাড়ী, বামডাঙ্গা, তারাপুরসহ সাদুল্ল্যাপুর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় এবার বিভিন্ন স্থানে পানের চাষ শুরু হয়েছে। একর প্রতি পানের বরজে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ করে পরবর্তী বছর থেকে প্রতিবছরে লাভ করেন ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। চলতি বছর গাইবান্ধা জেলায় প্রায় ৮ হাজার মেট্রিক টন পান উৎপাদন হয়েছে বলে ধারণা করছে।তবে জেলার কোনো সংরক্ষণাগার না থাকায় বিপদে পড়তে হয় পান চাষিদের। স্থানীয় বাজারগুলো থেকে পাইকাররা প্রতিবিড়া পান আকারভেদে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা দরে পাইকারিভাবে পান বিক্রি হয়।
তবে কৃষকরা জানান, বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত পানের বরজে ভরা মৌসুম। ভাদ্র থেকে মাঘ পর্যন্ত পানের উৎপাদন কম হয়। ফালগুন মাসে রাড়ন্ত লতিকে নিচে নামিয়ে দিতে হয়। এসময় পানের উৎপাদন হয় না বললেই চলে। পানের প্রতিবিঘা জমির পানের বরজে মাটির আইল, বেড়া, ছাউনি, শ্রমিক, পানের লতাসহ ১ থেকে দেড় লাখ টাকা প্রাথমিক অবস্থায় খরচ হয়। পরের বছর থেকে খরচ খুবই সামান্য হয়। কারণ একটি পানের বরজ তৈরি করার পর মাটির আইল, বেড়া, ছাউনি সংস্কার ছাড়া বছরের পর বছর পর্যন্ত কোনো নষ্ট হয় না। সেখান থেকে পান পাওয়া যায় প্রতিবছর।
গাইবান্ধার পাঁচ উপজেলার ২০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ হাজার ৮শ’ পানের বরজ রয়েছে। বছরে এক উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২শ’ টন পান উৎপাদিত হয়। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। স্বল্প খরচের এ আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছে অনেক পরিবার। তুলনামূলক উঁচু জমি যেখানে পানি জমে না এমন জমিই পান চাষের উপযোগী। খড়ের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে পানের বরজ করা হয়। এসব বরজ থেকে সপ্তাহে ২ দিন করে ১২ মাসেই পান তোলা যায়।
সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়েনের পানচাষী মঞ্জু মিয়া জানান, বাড়িতে বেকার বসে ছিলাম অনেক দিন। কাজ না পাওয়ায় হতাশভাবে জীবন চলছিলো। তবে স্বপ্ন ছিলো বিদেশ যাবো। পাসপোর্ট করেছি। পরে পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের পান চাষি মিন্টু মিয়ার পান চাষে লাভের কথা শুনে প্রথমে নিজেই ২৮ শতাংশ জমিতে শুরু করি পান চাষ। ওই বছর আমার লাভ হয় ৩ লাখ টাকা। পরে আরও ২৫ শতাংশ জমি নিয়ে মোট ৫৩ শতাংশ জমিতে পান চাষ। এখন বর্তমানে বছরে আমার লাভ হয় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। তার এ সাফল্যে দেখে অনেক কৃষক পানের উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রায় দিগুণ লাভ হওয়ায় পান চাষে ঝুঁকছেন।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আনার্স শেষ করে পান চাষ শুরু করেন লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের লিটন চন্দ্র। তিনি বলেন, দেশে ভালো কোনো চাকুরি যেন সোনার হরিণ। দীর্ঘদিন চাকুরির খোঁজ করে না পাওয়ায়। বাবার সঙ্গে পানের বরজে সময় দেই। বর্তমানে আমার ১ বিঘা জমিতে পানের বরজ আছে। ২০২০ সালে থেকে শুরু আমার পানের বরজ। তখন খরচ হয়েছিলো প্রায় ৩ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত আমার ৭ থেকে ৯ লাখ টাকার বেশি পান বিক্রি করছি। এখন আর চাকুরির পিছনে ছুটতে হয়না।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধর্মপুর বাজারের মিলন মিয়া বলেন, আমি আগে তামাক চাষ করতাম। তবে এখন আর তামাক চাষ করি না। বর্তমানে আমি পান চাষ করি। আমি গত বছর এক বিঘা জমিতে বাংলাপানের চাষ করেছিলাম। সেখানে আমার প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। প্রথমবার পানের বরজে একটু বেশি খবর হয়। কিন্ত পরের বার চাষ করতে খরচ কম। এ বছর আমি তিনবিঘা জমিতে বাংলাপানের চাষ করেছি।
লক্ষ্মীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবু কালাম আজাদ জানান, সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়েনের বেশির ভাগ জমিতে এখন পান চাষ দেখা যাচ্ছে। এখানকার উৎপাদিত পান সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা ও দাম বেশি। পান চাষকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গাইবান্ধার উপ-পরিচালক বেলাল উদ্দিন জানান, গাইবান্ধায় পাঁচ উপজেলায় পান চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পান চাষে রোগবালাই ও ঝুঁকিকম থাকায় স্থানীয় কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ অঞ্চলে পান চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবার উৎপাদিত পান থেকে প্রায় কোটি টাকা আয় হবে।
আনন্দবাজার/এম.আর









