- কোরবানির পশু নিয়ে আতঙ্কে ডিমলার খামারিরা
ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নীলফামারীর নদীবেষ্টিত উপজেলা ডিমলায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর তীর উপচে পানি ঢুকে পড়েছে বাড়িঘরে। এদিকে উপজেলার নদীর তীরবর্তী ৬টি ইউনিয়নের ১৫টি চরে প্রায় দশ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বন্যাকবলিত এসব চরাঞ্চলের যোগাযোগ, অবকাঠামো, ঘরবাড়ি, ফসল ও শাকসবজির পাশাপাশি পশু সম্পদের ওপরও বড় আঘাত এসেছে। বিশেষ করে কোরবানির হাটের উদ্দেশ্যে যারা গবাদি পশু লালন পালন করেছে তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বন্যাদুর্গত অনেক এলাকায় পশুর প্রয়োজনীয় খাবার এখন দুর্লভ। অনাহারে কিংবা পচা খাদ্য খেয়ে অনেক পশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া পশু কোথাও নিতে পারছে না বন্যা বা ভাঙাচুরা রাস্তার কারণে। অথচ ঈদের বেশি দিন বাকি নেই। নিরূপায় হয়ে অনেকে কম দামে পশু বিক্রি করে দিয়েছেন। বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকার খামারি ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পানিবন্দি হয়ে বেড়িবাধে গরু ও ছাগলগুলো অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে। চারণভূমি ডুবে যাওয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না সবুজ ঘাস। গোখাদ্য বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। কেউ কেউ পানির নিচ থেকে পচা ঘাস তুলে এনে গরুকে খেতে দিচ্ছে। এতে গরু আরও বেশি রোগাক্রান্ত হচ্ছে। এতে অনেক মালিক কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া স্থানীয় হাট বাজারগুলোতে ভারতীয় গরুর দাপটে অনেকে বিক্রির জন্য ক্রেতাও পাচ্ছেন না বলে জানান খামারিরা।
সুন্দর খাতা গ্রামের খামারি নুর ইসলাম জানান, কোরবানির জন্য ১০৬টি গরু কিনে পালন করছিলাম। ভালোই চলছিল খামার, মোটা অঙ্কের লাভ করার আশা ছিল। তবে বন্যা এসে বাধা হয়ে দাঁড়াল। বন্যার কারণে আমার ৬০ শতাংশ জমির নেপিয়ার ঘাস পানিতে ডুবে পচে গেছে। এদিকে গোখাদ্যের দাম তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসায় স্থানীয় হাটগুলোতে গরুর দাম অনেক কম। ভারতীয় গরুর ভিড়ে স্থানীয় খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েছে। নিরুপায় হয়ে ২ লাখ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছি। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এ এলাকায় গরুর খামারিদের অস্তিত্ব থাকবে না।
বাইশপুকুর গ্রামের খামারি আব্দুর রহিম বলেন, ৪০টি ছাগল রয়েছে আমার খামারে। এগুলো কোরবানিতে বিক্রি করবো। তবে, ঈদের আগে বন্যায় দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এছাড়া দশটির মতো ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
কিসামত চরের তবিবুল, আসমাসহ বেশ কয়েকজন খামারি জানান, দুই নদীর মাঝখানে আমাদের গ্রাম। এখানে শতাধিক পরিবার কোরবানির জন্য পশু পালন করেছে। তবে, পানিবন্দি হওয়ায় আমরা গরু বিক্রি করতে পারছি না। পাইকাররা যে দাম বলে তাঁতে গরু প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। আবার গো খাদ্য সংকট থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকে লোকসানে গরু বিক্রি করছে।
বালাপাড়া গ্রামের গরুর খামারি আরিফ হোসেন জানান, কোরবানির হাটে বিক্রির ২০টি গরু প্রস্তুত করেছি। তবে, সঠিক পরিমানে খাদ্য দিতে না পারায় গরু গুলোর ওজন কমে গেছে। স্থানীয় হাটে দাম কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে গত দুদিন আগে গরু বিক্রি করতে ঢাকায় এসেছি। এখন পর্যন্ত একটিও গরু বিক্রি করতে পারিনি। মোটা অংকের লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি ।
তিনি আরো বলেন, চড়া দামে ঘাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। খড়ের দাম দ্বিগুন। দানাদার খাবার, ধানের কুঁড়া, খৈল, চিটাগুড় সবই ৬০ শতাংশ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জানায়, কোরবানির জন্য এ উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার খামারি ১১ হাজার ৭৬৯টি দেশী ও সংকর জাতের গরু, ছাগল ১৭ হাজার ৯২৮টি ছাগল, ২হাজার ৫৪২টি ভেড়া ও ৫৩টি মহিষ মোটাতাজাকরন প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করেছে। এর বাইরেও অনেকে ১ থেকে ২টি পশু কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য পালন করেছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, বন্যা কবলিত এলাকায় পশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসা দেওয়ার জন্য আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করছি। কোরবানির পশুর যে যোগান আছে তা দিয়ে চাহিদা মিটিয়েও অন্য উপজেলায় চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে বিভিন্ন কারণে খামারি বা কৃষক হয়তো একটু কম দাম পাবে। যেহেতু পশুগুলোর খাদ্য সংকট আছে এবং তাদের স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদদৌলা বলেন, পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি ক্রমশ বাড়ছে আবার কমছে।









