নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদী। দেশের নদীর সংখ্যা ২৩০টির কথা বলা হলেও অশোক বিশ্বাসের নদীকোষ বইয়ে সাতশর বেশি নদীর কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, দেশে নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। অবশ্য উইকপিডিয়া ৩১০টি নদ-নদীর তথ্য দিচ্ছে। যেসব নদ-নদী ২৪ হাজারের বেশি কিলোমিটার জুড়ে অবস্থান করছে। যেসব নদ-নদীর বড় অবদানে সমৃদ্ধ দেশের কৃষি ও মৎস্যখাত।
তবে বিশাল পরিধির এই জলরাশি বর্তমানে হুমকির মুখে। নাব্যতা হারিয়ে মরাখালে পরিণত হয়েছে বেশিরভাগ নদী। যা পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। হুমকিতে পড়েছে দেশের কৃষি ও মৎসখাত। এক সময়ে খরস্রোতা বহমান নদী জুড়ে এখন শুধুই ধুধু বালুচর। কোথাও আবার নদীর বুক জুড়ে ফলছে ফসল।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশে দুইভাবে নদীর বিপর্যয় ঘটছে। অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয়। অভ্যন্তরীণ কারণগুলো হলো- নদীর বুক ও পাড়ের জমি দখল, চাষাবাদ, স্থাপনা নির্মাণ, পাড় কাটা, পাথর ও বালু আহরণ, বাঁক কেটে গতিপথ পরিবর্তন করা। একইভাবে সেচ খাল তৈরি, পানি সরিয়ে নেয়া, কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বোল্ডার নির্মাণ, বিরতিহীন পাড় বাঁধাই করার কারণে নদীর বিপর্যয় ঘটে চলেছে।
তাছাড়া ঢাকা ও হবিগঞ্জের মতো শহর বা জনপদ, বিরতিহীন বাঁধ নির্মাণ, নদীর উপর বাঁধ-সেতু-জলবিদ্যুৎ প্রকল্প জলাধার বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ, নদীর পানিতে বোল্ডার ও পাথর নিক্ষেপ, গাছ-গাছালির ফাঁদ স্থাপন, পানিতে অতিরিক্ত কচুরিপানা, উন্নয়নের নামে পাড়ের গাছ কাটা, নদী পাড়ে নৌযান ভাঙা ও নির্মাণ সামগ্রীর স্তূপ, নদীর পানিতে শহুরে ও গ্রামীণ শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক সার-কীটনাশক নিক্ষেপ ও মিশ্রণের কারণে প্রতিনিয়ত নদীর জীববৈচিত্র ও অবকাঠামোর বিপর্যয় ঘটছে।
অন্যদিকে, বহির্দেশীয় বিষয়গুলোর মধ্যে দেশে প্রবেশকারী প্রায় সব নদীই ভারতীয় ও মিয়ানমার অংশে হওয়ায় সেসব দেশ নদীর উপর বৃহৎ স্থাপনা বাঁধ, সেচ বা পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প করছে। যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) গবেষণা সূত্রমতে, দেশের দেড় হাজার ছোট নদীর মধ্যে অধিকাংশই শুকিয়ে বিলুপ্তির সীমানায় পৌঁছে গেছে। বর্তমানে কোনোভাবে বেঁচে আছে প্রায় ২৩০টি নদী। এর মধ্যে ৫৪টি ভারত ও ৩টি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সবগুলো নদী এখন বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। যার মধ্যে ২৫টির অবস্থা ভয়াবহ। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর চাষাবাদের কারণে অনেক নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
ছোটবড় মিলিয়ে দেশের ১৬৩টি নদী (মোট নদীর ৭০ শতাংশ) নিয়ে পর্যালোচনা করে বাপা এতে নদীগুলোর বর্তমান দুরবস্থার পর্যায় ও মাত্রা নির্ণয়, বিপর্যয়ের কারণ ও দায়ী বিষয়গুলো চিহ্নিতকরণ, বিদ্যমান দুরাবস্থার নিরসন ও প্রতিরোধ, নদীরক্ষার কার্যকর উপায় নির্ধারণ, সামগ্রিক প্রচেষ্টায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ভূমিকা, সামাজিক সংগঠনসমূহের করণীয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার দায়দায়িত্ব নিরূপণের একটি নির্মোহ প্রয়াস নিয়ে সুপারিশ করা হয়।
পর্যালোচনায় বলা হয়, নদী-নদীর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সব নদীই দীর্ঘমেয়াদি, অবারিত ও ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়ের শিকার। পানির পরিমাণ ও প্রবাহ হ্রাস, নদীর কলেবর সংকোচন, তলা ভরাট, পাড় ভাঙন, দিক পরিবর্তন, নদীর বুক জুড়ে ব্যাপক চর সৃষ্টি, বর্ষায় প্লাবন ও শীতে খরা, নদী সংশ্লিষ্ট খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ে পানির পরিমাণ হ্রাস বর্তমানে নদী সংকটের সাধারণ রূপ।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের নদ-নদীর ওপর। বদলে যাচ্ছে নদীভিত্তিক দৃশ্যপট। এর মধ্যেই বিলুপ্তপ্রায় নদীর সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে মূল নদীর সংযোগ। অনেক নদীর আর কোনো চিহ্ন মিলছে না। কোনো কোনো সড়কে যে নদীর ওপর ব্রিজ তৈরি হয়েছিল সেটাও আর বোঝার উপায় নেই। কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল খরস্রোতা নদী, সেটাও আর চেনার উপায় নেই।
অনেক নদীই এখন নালার মতো হয়ে গেছে। ভাঙনের কবলে নদীপাড়ের অনেকেই এখন বাড়িঘর ও জমিজমা হারা। নদীর নব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতের উপর। জমি হয়ে পড়ছে অনুর্বর। উৎপাদন বাড়াতে জমিতে যে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে জমির উর্বরতা শক্তি আরও কমে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, নদী বিলীন হলে পরিবেশ ও জলবায়ুর বিপর্যয় আরো বাড়বে। এর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে ফিরিয়ে আনতে হবে নদীর নাব্যতা।
অন্যদিকে, নদীতে সারাবছর পানি না থাকায় নাকাল দেশীয় মাছ। মাছে-ভাতে বাঙালি কথাটা থাকলেও সেই দেশীয় মাছ অহরহ আর মিলছে না। বাজারে অধিকাংশ মাছই আসছে পুকুরের চাষ থেকে। বাজার ভরা মাছ থাকলেও দেশীয় মাছের আকাল দেখা দিচ্ছে। নদী বিলুপ্তের পথে থাকায় দেশীয় মাছও হারিয়ে যাচ্ছে।
আনন্দবাজার/শহক









