২০১৮ সালে সেন্টার ফর এনভায়রোমেন্টাল আন্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (সিইআরএম) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) যৌথভাবে– ই-বর্জ্য তৈরির পর্যালোচনা, বাংলাদেশে এর পরিবেশগত প্রভাব ও সম্পদ পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা– শীর্ষক বেজলাইন সমীক্ষা পরিচালনা করে। এই গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ২০৩৫ সালে নাগাদ যার পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৬ লাখ ২০ হাজার টন। অর্থাৎ, বার্ষিক ২০ শতাংশের মতো উচ্চহারে বাড়ছে ই-বর্জ্য।
অন্যদিকে, সোনা, রুপা, প্ল্যাটিনাম, প্যালাডিয়াম, নিডোমিয়ামসহ অন্যান্য দামি ধাতু থাকায় ই-বর্জ্যকে 'আরবান মাইন' বলা হয়। এরমধ্যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সীসার মতো ধাতুও রয়েছে। পরিবেশ-সম্মত কার্যকর উপায়ে এসব ধাতু সংগ্রহ করা গেলে ই-বর্জ্য পরিণত হবে একটি মূল্যবান সম্পদে। ২০১৮ সালের বেজলাইন সমীক্ষাটি জানায়, ১ টন হ্যান্ডসেটে থাকে সাড়ে তিন কেজি রুপা, ৩৪০ গ্রাম সোনা, ১৪০ গ্রাম প্যালাডিয়াম এবং ১৩০ কেজি তামা।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় ই-ওয়েস্ট সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, সবশেষ স্তরের ভোক্তা এবং এসব পণ্যের মেরামতকারীদের নিজস্ব খরচে ই-বর্জ্য অনুমোদিত হ্যান্ডলার (রিসাইক্লিং) প্রতিষ্ঠানের কাছে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, এরপর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে এসব পণ্য খুলে বা পৃথক করে পরিবেশ-সম্মত উপায়ে রিসাইকেল করবে।
তবে এই বিধির প্রয়োগ নেই সেভাবে। ই-বর্জ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট ডাস্টবিনের প্রচলনও বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পায়নি। এছাড়া, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি থেকে এটি সংগ্রহের চ্যানেলও নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে অনুনোমোদিত ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীরাই নিয়ন্ত্রণ করছেন পরিবেশের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং একইসাথে অব্যবহৃত রয়ে যাওয়া অমিত সম্ভাবনার ই-বর্জ্যের ব্যবসা।
সোনা, রুপা, প্ল্যাটিনাম, প্যালাডিয়াম, নিডোমিয়ামসহ অন্যান্য দামি ধাতু থাকায় ই-বর্জ্যকে ‘আরবান মাইন’ বলা হয়। এরমধ্যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সীসার মতো ধাতুও রয়েছে। পরিবেশসম্মত কার্যকর উপায়ে এসব ধাতু সংগ্রহ করা গেলে ই-বর্জ্য পরিণত হবে এক মূল্যবান সম্পদে।
ঢাকার সাভারের জেআর রিসাইক্লিং সলিউশন্স এর স্থাপনায় ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ বাছাইয়ের কাজ করছিলেন দুই দল কর্মী। সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে একদল রাবারের ইনসুলেশন থেকে তামার তার আলাদা করছিলেন; আরেকদল ব্যস্ত ছিলেন কম্প্রেশার এয়ারগান দিয়ে স্মার্টফোনের স্ক্রু খোলায়। এভাবে পুরনো ও বাতিল এসব পণ্য খুলে সেখান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছিল অ্যালুমিনিয়ামের চাকতি, ধাতব স্ক্রু ও প্লাস্টিক। স্যামসাং বাংলাদেশের উচ্চ মানের হ্যান্ডসেট তৈরির কারখানা থেকে এসব বাতিল পণ্য জেআর রিসাইক্লিং সলিউশন্সে পাঠানো হয়েছে। কারণ, পুরোনো জিনিস খুলে আহরণ করা উপকরণের আছে পুনর্ব্যবহার মূল্য (রিসাইক্লিং ভ্যালু)/ বা উপযোগিতা।
জেআর সলিউশন্স-সহ বাংলাদেশের ছয়টি কোম্পানি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স পেয়েছে, যার আওতায় তারা সংগ্রহ করা আইটেমগুলো রপ্তানি করতে পারে। এদের মধ্যে, ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে জেআর রিসাইক্লিং সলিউশন্স। কোম্পানিটি পুনরুদ্ধার করা আইটেম রপ্তানি করে। তাদের বেশিরভাগ রপ্তানিই হয়– জাপান ও কাতারে। বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩০ কোটি টাকা। তবে ব্যবসার এই পরিসরে সন্তুষ্ট নন এর কর্মকর্তারা বলেন, দেশে যে বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্য প্রতিবছর তৈরি হচ্ছে, তার সামান্য অংশ্যই সংগ্রহ করতে পারছে সনদপ্রাপ্ত ই-বর্জ্য রিসাইকেল কোম্পানিগুলো।
অপরদিকে, এই বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীরা। তারা সরাসরি চীনে স্ক্র্যাপ বা ভাঙ্গারি হিসেবে রপ্তানি করে। ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ এর শিথিল প্রয়োগই এজন্য দায়ী। আন্তর্জাতিক কমপ্ল্যায়েন্সের আওতায়, বহুজাতিক টেলিকম অপারেটররা নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের ই-বর্জ্য দিলেও, বেশিরভাগ সরকারি সংস্থা এক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়ায় সর্বনিম্ন দরদাতা ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না নিবন্ধিত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপক কোম্পানি।
২০১৮ সালের সিইআরএম-বুয়েট এর সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ই-বর্জ্যে থাকে সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি)-র মতো বিষাক্ত ও ক্ষতিকর উপাদান। আরো থাকে পলিব্রোমিনেটেড ডিফাইনিল ইথার এবং পলিব্রোমিনেটেড বাইফেনিল- এর মতো অর্গানিক উপাদান, যা দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ দূষণের কারণ হয়। পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক এই বর্জ্যকে সম্ভাবনাময় ব্যবসায় পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে জেআর রিসাইক্লিং সলিউশন্স। ই-বর্জ্য হ্যান্ডলিং ও রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ বছরে ৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। প্রাথমিক এক হিসাব অনুসারে, এই ব্যবসায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
পরিবেশসম্মতভাবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং এই ব্যবসার রপ্তানি সম্ভাবনাকে সুবিধা দিতে– নিবন্ধিত ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের কাছে অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা বাস্তবায়নের অনুরোধ করে আসছে। ২০১১ সালে প্রথম খসড়া প্রস্তুতের পর– এটি কার্যকর করতে প্রায় ১০ বছর লেগে যায় সরকারের। জানা যায়, এনিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কিছু উদ্বেগ থাকায় এই বিলম্ব হয়।
আনন্দবাজার/শহক









