- কৃষিশ্রমে কোটি ছাড়িয়েছে নারীর সংখ্যা
- তবুও বেতন বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা
সূর্যের আলো না ফুটতেই মহিষ বা গরুর সঙ্গে নাঙ্গল নিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়তো কৃষকের দল। কেউ বা কোদাল নিয়ে, আবার কেউ জমির নিড়ানি দিতে। কোমরে বাঁধা গামছায় মুড়ি ও একদলা গুড় নিয়ে। পান্তা বেলা না হওয়ার আগে যদি ক্ষুধা লাগে তখন মুড়ি ও গুড় চিবিয়ে নেয়া যাবে। সারা মাঠজুড়ে যেনো এ কাজের মহাযজ্ঞ। ওই সময় মাঠে শ্রমিক হিসেবে নারীদের খুব বেশি একটা চোখে পড়তো না।
তবে চিত্র এখন ভিন্ন। গ্রামের অনেক পুরুষ শহরমুখি হয়েছে। আবার কেউ বেছে নিয়েছে ভিন্ন পেশা। যাওয়ার কারণে কৃষিকাজের এ জায়গাটি চলে এসেছে নারীদের হাতে। বর্তমান সময়ে নারীরা গৃহস্থালি কাজের বাহিরেও কৃষি কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। কৃষি কাজে নারীদের অবদান এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বরেন্দ্র অঞ্চলের তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, গোমস্তাপুর, নওগাঁর পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর, ধামইরহাট, মহাদেবপুর উপজেলায় কৃষি কাজে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এ সকল নারীরা অন্যের জমি কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকেন। এ নারীরা পুরুষের সমপরিমান কাজ করলেও মজুরি বৈষম্যের শিকার হন তারা। কৃষিকাজে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমতে শুরু করলে প্রথমে জায়গাটি দখলে নেয় আদিবাসী নারীরা। তবে ধীরে ধীরে অন্য নারীরাও এ কাজে জড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আর্কাইভ থেকে ১৯৬১, ১৯৭৪ ও ১৯৮১ সালের জাতীয় জনসংখ্যা জরিপ এবং ১৯৮৩ সালের পর থেকে শ্রমশক্তি জরিপে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাÐ হিসেবে কৃষিতে পুরুষের সংখ্যা কমছে, আর নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ১৯৬১ সালের জরিপ অনুসারে, কৃষিতে নারীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪২৩। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসংখ্যা জরিপ ১৯৭৪ অনুসারে, ওই সময় দেশে অর্থনৈতিক কৃষিকাজে যুক্ত ৬১০ জন নারী। সে সময়ে মোট নারীর সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪৪ লাখ।
২০১৮ সালে প্রকাশিত সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুসারে, কৃষিতে এখন নারীর অংশগ্রহণের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেছে। জরিপের বছরে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ১৩ লাখ। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩ লাখ। জাতীয় জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, কর্মজীবী নারী ও পুরুষের নিজ নিজ ক্ষেত্র অনুসারে ১৯৭৪ সালে ৭০ শতাংশ নারী ও ৭৭ শতাংশ পুরুষ, ১৯৮১ সালে ২৭ শতাংশ নারী ও ৬১ শতাংশ পুরুষ, ১৯৯৯-২০০০ সালে ৪৮ শতাংশ নারী ও ৫০ শতাংশ পুরুষ, ২০১০ সালে ৬৫ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষ কৃষিতে যুক্ত ছিলেন।
সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুসারে, পুরুষদের মধ্যে যতসংখ্যক পুরুষ কৃষিকাজে যুক্ত, তার চেয়ে নারী কর্মজীবীদের মধ্যে অনেক বেশিসংখ্যক নারী কৃষিকাজে যুক্ত। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত।
নওগাঁর পোরশার উপজেলার সিহন্ডী আদিবাসী পাড়ার নারী ফুল জানান, আদিকাল হতে বংশ পরম্পরায় আমরা কৃষি কাজ করে আসছি। কৃষিকাজই আমাদের প্রধান পেশা হিসেবে যুগ যুগ চলে আসছে। কৃষি উন্নয়নে অবদান ও ভালো কাজ করলেও পুরুষদের তুলনায় আমাদেরকে কম মজুরি দেন। একজন আদিবাসী পুরুষ শ্রমিক পান ৪০০ টাকা। নারী শ্রমিকরা পান ৩০০ টাকা।
একই উপজেলার শুড়িপুকুর গ্রামের গুল্টি রানী’র স্বামী ঝড়– মÐল দীর্ঘদিন আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর থেকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তবে সম্প্রতি সময়ে অন্য নারীদের মতো গুল্টি রানীও মাঠে কৃষিকাজে নেমে পড়ছেন।
গুল্টি রানী জানান, মানুষের বাড়িতে কাজ করে বেশি অর্থ আয় করা যায় না। নারী হিসেবে সারাদিন মাঠে ধান কাটার কাজ করলে ৩০০ টাকা পাওয়া যায়। মাঠে অনেক ধরনের কাজ থাকে। ধান রোপন থেকে শুরু করে, নিড়ানী, কাটা, মাড়াই। প্রায় সারাবছরই কাজ লেগেই থাকে।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার রায়ঘাটি আদিবাস পাড়ার নারী শ্রমিক গরেটি খালকো বলেন, পুরুষের পাশাপাশি ধান কাটা মাড়াইসহ বিভিন্ন কৃষিকাজ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছি। কিন্তু মজুরি দেয়ার সময় আমরা নারী বলে বৈষম্যে করা হয়।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ গোদাগাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি নন্দলাল টুডুর জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী নারীরা পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে সমানতালে কাজ করলেও মজুরির বেলায় প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, গোদাগাড়ী উপজেলায় প্রায় ১২ হাজারের বেশি আদিবাসি নারী শ্রমিক কৃষি কাজের সাথে জড়িত রয়েছেন।
আনন্দবাজার/এম.আর









