নওগাঁয় বছরে ১৭ কোটি টাকার বিষ মিশছে মাটিতে
- হাইব্রিডের ব্যাপকতায় বাড়ছে কীটনাশক
- অপুষ্ট বীজে দুর্বল ফসলে বাড়ছে প্রয়োগ
- পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি
পরিবেশ ও মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় পৃথিবীর অনেক দেশে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশসহ বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
কীটনাশকের ইচ্ছেমতো ব্যবহারের বিরূপ প্রভাব ফসলের মাঠ পেরিয়ে মানবদেহ পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। উৎপাদিত ফসল হয়ে পড়ছে বিষাক্ত, যা গ্রহণের মাধ্যমে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে কীটপতঙ্গ দমনের নামে কীটনাশক ব্যবহার পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকির সৃষ্টি করছে। বিষাক্ত বিষ ও রাসায়নিক প্রয়োগে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি এসব উৎপাদিত ফসল খেয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
পরিবেশ ও মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় পৃথিবীর অনেক দেশে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশসহ বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কৃষিবিভাগের দাবি কীটনাশকের যথেচ্ছ প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মৌমিতা জলিল দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, কীটনাশক মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অতিমাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন কৃষি ও প্রাণিজ খাদ্যের মাধ্যমে কীটনাশক মানবদেহে প্রবেশের কারণে মানুষের হার্ট, কিডনি, লিভার, স্নায়ু, ত্বকসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া, গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটিযুক্ত সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হয় এ বিষক্রয়ায়। তাই কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। সবার অক্লান্ত প্রচেষ্টা গণমানুষের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্যেরযোগান নিশ্চিত করা এবং কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার পরিবেশ, মানবদেহ ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিরুপ প্রভাব ফেলছে। যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
এদিকে দেশি প্রজাতির বীজের বদলে হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের কারণেও কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের প্রয়োগ বাড়ছে। কীটনাশকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির আরেকটি কারণ কৃষিক্ষেত্রে দুর্বল ও অপুষ্ট বীজের উপস্থিতি। দুর্বল বীজের মাধ্যমে ফসলের মাঠে যে দুর্বল চারাগাছের উৎপাদন হয় তা সহজেই কীটপতঙ্গের আক্রমণের শিকার হয়। আর এটা রোধেই কৃষককে ফসলের মাঠে ব্যাপকমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে।
এসব কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ক্ষেতের আশপাশের নদী, নালা, খাল-বিল এমনকি জলাভূমিতে তা ছড়িয়ে পড়ে উদ্ভিদ, সাপ, ব্যাঙ, মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী মারা যায়। কীটনাশক প্রয়োগের এক সপ্তাহ পর ফসল সংগ্রহ করার কথা থাকলেও অনেক কৃষক তা প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংগ্রহ করে বাজারজাত করছেন।
কীটনাশক স্প্রে করা সবজি, ফল ও খাদ্যশস্য রান্নার পরও এর বিষ নষ্ট হয় না। এ এলাকায় প্রতিবছর যে পরিমাণ ধান, ফল-মূল ও শাক-সবজি উৎপন্ন হচ্ছে তাতে মেশানো হচ্ছে অন্তত ১৭ কোটি টাকার কীটনাশক। বিপুল পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ফসলি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। পরিবেশ হারাচ্ছে তার জীববৈচিত্র্য আর মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগ-ব্যাধিতে।
এছাড়াও প্রায় সব কৃষক কীটনাশক স্প্রে করার সময় তাদের হাত-পা ঢাকার জন্য কোনো কিছু ব্যবহার করে না। হাত মোজা বা গ্লাভস ব্যবহার, নিরাপত্তার জন্য চশমা ব্যবহার এবং কাপড় দিয়ে নাক ঢাকা নিয়ে কৃষকদের যথেষ্ট জ্ঞান না থাকায় তারা জমিতে মুক্তভাবে কীটনাশক ব্যবহার করছেন।
কৃষকরা জানান, তারা ইচ্ছামতো কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। কতটুকু জমিতে কী পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত, এমনকি ফসল তোলার কতদিন আগে ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত সে ব্যাপারে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধারণা নেই।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামছুল ওয়াদুদ জানান, আমরা আইপিএমসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়াও কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার, ফেরোমোন বড়ি এবং হাত দিয়ে পোকা দমনসহ যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে তারা ধৈর্য্য ধরতে চায় না। তাৎক্ষণিক ফলাফল পেতে কীটনাশক বিক্রেতাদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে একের পর এক বিভিন্ন কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করে। যা জমি ও মানবস্বাস্থ্য উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।









