- যশোরে পোনামাছ বিক্রয় কেন্দ্রে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য
অবশেষে পোনামাছ উৎপাদনের সূতিকাগার যশোরে মাছ চাষি ও ব্যবসায়িদের স্বস্তি ফিরেছে। ধান কৃষকের শঙ্কার মধ্যেই তারা মাঠে নেমে নতুন মৎস্য মৌসুম বরণ করে নিয়েছেন। পোনামাছ বিক্রয় কেন্দ্র চাঁচড়া বাবলাতলা ও সব্জীবাগে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
একসময় প্রায় ২০০ ছোট বড় মৎস্য রেনু বা ডিমের হ্যাচারি গড়ে ওঠে যশোরে। তবে এখন সংখ্যা অনেক কমেছে। বড় হ্যাচারির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বলাডাঙ্গা-কাজীপুর, ডালমিল, চাঁচড়ায় হ্যাচারীর সংখ্যা সর্ব সাকুল্যে একশোর কম। তবে তাতে কোন অসুবিধা তৈরি হয়নি। ফি বছর মৎস্য উৎপাদন ও চাষের পরিধী এখানে বাড়ছেই। সরকারি খাল বিল নদী বাওড় পরিমানে কমলেও ব্যক্তি উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছে ছোট বড়া হাজার নার্সারী বা মৎস্য প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে সিংহভাগ পোনা মাছ চাষ প্রকল্প। পাশাপাশি প্রভাব বিস্তার করে জুড়ে আছে রেনু প্রকল্প এবং বাজারে মাছ চাষ। মাত্র কয়েক দিন আগে অনাবৃষ্টি ও খরতাপের দিশেহারা পরি¯ি’তির অবসান হয়েছে। এখন স্বস্তির ছাপ মাছ চাষী ব্যবসায়ী হ্যাচারী মালিক কর্মচারীদের মাঝে। ২/৩ দফা বৃষ্টিতে উন্নত হয়েছে পানির লেয়ার। মৎস্য চাষের মৌসুমের ব্যস্ততা ভর করেছে এই খাতের সকলের মাঝে।
চাঁচড়া, আরবপুর, ফতেপুর, নওয়াপাড়া ইউনিয়নে দেখা যায় পোনা মাছ ব্যবসায়িরা তাদের পুকুর বা ছোটবড় সকল জলাধার সংস্কার করে সেখানে মাছের পোনা সংরক্ষনে ব্যস্ত। প্রায় ৯০ ভাগ স্যালো টিউবয়েল সচল হয়েছে। তা থেকে আবারো উঠতে শুরু করেছে পানি। এবং তা স্বাভাবিক পানি দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ এরি মধ্যে যশোরের বাইরে মৎস্য রেনু পাঠানো শুরু করেছেন। মৎস্য হ্যাচারী গুলোর ব্যস্ততা আরো বেশি। ডালমিল ন্যাশনাল হ্যাচারীতে ২৪ ঘন্টা ব্যস্ততা রয়েছে। যশোরের পাশাপাাশি বাইরে থেকেও ডিম বা রেনু মাছের অর্ডার আসছে বলে জানালেন হ্যাচারী মালিক আমিরুল ইসলাম। রেনু ব্যবসায়ী ও চাষী ডালমিলের ইদ্রিস আলী জানান তিনি ইতিমধ্যে মাদারীপুরে দুই চালান রেনু সরবরাহ করেছেন। অবশ্য চাঁচড়ার ভাই ভাই মৎস্য প্রকল্পের মালিক খলিলুর রহমান খলিল জানান তার পাবদা রেনু পোনা সাপ্লাই এখনো শুরু করা যায়নি। পরবর্তী ২/১ দিনে সেটা সম্ভব হবে। ডালমিলে রয়েছে আলহাজ্ব ফিরোজ খান ও হাজী আনিছুর রহমান মুকুলের মা ফাতিমা মৎস্য হ্যাচারী, চৌধুরী হ্যাচারী, রীতা মৎস্য হ্যাচারী। সব্জী বাগে অব¯ি’ত সোনালী হ্যাচারী, রুপালী মৎস্য ফিশ হ্যাচারী। মধুমতি হ্যাচারী ও কপোতাক্ষ হ্যাচারীও আলো ছড়াচ্ছে গভীর রাতে। অর্থাৎ তাদের ব্যস্ততা চলছে দিন রাত ২৪ ঘন্টা। চাঁচড়ার হক ফিশ এখন বেজায় ব্যস্ততায়। সেখানে লোকজনের আনাগোনা যেমন বেড়েছে। ডিম বা রেনু নিয়ে ডাক্তার, মালিক, কর্মচারীরা পরিশ্রমে ব্যস্ত। চাঁচড়ায় রয়েছে লুলু হ্যাচারী, নিরিবিলি হ্যাচারী। যশোরে বিসমিল্লা হ্যাচারী একটি পুরাতন হ্যাচারী। সুনামের সাথে তারা এবারো রেনু বা ডিম উৎপাদনে ব্যস্ত। চাঁচড়ায় জাহিদুর গোলদারের মাতৃফিশ হ্যাচারী, সাইফুজ্জামান মজুর শুভ এন্ড প্রুমা হ্যাচারী সুনাম ছড়িয়েছে। বলাডাঙা কাজীপুরে আলীর হ্যাচারী ডিম বা রেনু উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য একটি নাম। এছাড়া রয়েছে সুনাম কাামানো চাঁচড়া পিডিবি মোড়ের রবিউল ইসলাম রবির ফ্রেন্ডশীপ মৎস্য খামার ও আর এন রোডের সানোয়ার মৎস্য খামার।
আশির দশকে যশোরে মাছের রেণু উৎপাদনের বিস্তার ঘটে মৎস্য প্রবাদ পুরুষ সব্জীবাগের স্থপতি মহসিন মাষ্টারের হাত ধরে। যশোর জেলায় ১৩,৬২৬ হেক্টর জলায়তন বিশিষ্ট পুকুর ও ১৩,৯৩১ হেক্টর বাঁওড় রয়েছে। হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত রেণু পোনা এসব জলাশায়ে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। শহরের চাঁচড়াসহ আশপাশের এলাকায় রয়েছে ৮৭টি হ্যাচারি। রুই, কাতলা, থাই পাঙাশ, শিং, কই, মাগুর, সিলভার কার্প, কালবাউশ, মিরর কার্প, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সাত থেকে আট হাজার কেজি রেণু পোনা উৎপাদন করা হয় প্রতি মাসে। মোট উৎপাদন হয় গড়ে ৫০ হাজার কেজি রেণু পোনা। প্রতি কেজি রেণু গড়ে দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। মাসে এখানে সাড়ে ছয় কোটি টাকার রেণু পোনা বিক্রি হয়। এছাড়া দেশের একটি বৃহত্তর অংশের মাছ চাষিদের জীবিকা নির্বাহ হয় এ উৎপাদিত রেণু পোনা থেকে। এসব হ্যাচারি উৎপাদিত রেণু পোনা দেশের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করছে বলে দাবি জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির। তবে তা এখন ৬০ থেকে ৬৫ পার্সেন্ট বলেছেন দায়িত্বশীল অনেকেই।
যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, যশোরে কার্প জাতীয় মাছ চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। স্বাদু পানির মাছের মধ্যে দেশী শিং, কৈ, মাগুর, রুই কাতলা, মৃগেল, বাটা, পাঙাশ ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়। দেশি কৈয়ের পাশাপাশি চাষ হচ্ছে থাই ও ভিয়েতনামের কৈ। যশোরের রেণু মাছের গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশব্যাপী সুনাম রয়েছে। এসব পোনা বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। যশোরে মাছের রেণু পোনা উৎপাদনে খরচ অপেক্ষাকৃত কম। গড়ে এখানে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিচুর রহমান জানান, যশোরের হ্যাচারি পল্লীখ্যাত চাঁচড়ায় সাদা রঙের প্রায় সব ধরনের মাছের রেণু চাষ হয়। ভালোমানের জন্য যশোরের পোনার খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ জুড়ে। চলতি বছরে ৬ দশমিক ৮২ মেট্রিক টন রেণু পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্নতজাতের ও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছের পোনা উৎপাদেন জেলা ও সদর উপজেলা মৎস্য বিভাগ সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তাছাড়া চাঁচড়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্মাণ করা হয়েছে মাছের পোনা বিক্রির আধুনিক বিক্রয় কেন্দ্র। চলতি ২০২২ সালের মার্চ এপ্রিল থেকে এখানে মাছের রেণু-পোনা বিক্রয় শুরু হয়েছে। এটি মাছ চাষী ও ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বড় একটি খবর। হ্যাচারি পল্লীর মানুষ কয়েক মাসের জড়তা আলসেমি কাটিয়ে আবারো আয়ের ধারায় ফিরেছে পুরোদমে। তাদের পকেটও এখন চাঙ্গা। নতুন বাংলা বছরের গ্রীষ্ম মৌসুমের বৈশাখী ঝড় বৃষ্টিতে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে একথা সত্য। ধানচাষীরা এ কারনে উদ্বিগ্ন। তবে চাষাবাদ এমনি। একই আবহাওয়া কাউকে কাঁদায় আর কাউকে হাসায়। এক্ষেত্রে ধানচাষীরা দিশেহারা আর মাছ চাষী ব্যবসায়ির উৎফুল্ল।









