আজ থেকে কয়েক দশক আগে সংবাদমাধ্যম হিসেবে ইলেকট্রনিক মিডিয়া আর রেডিও-টিভির বিপ্লব শুরু হলে গণমাধ্যমবিষয়ক একটি বিতর্ক দুনিয়াজুড়েই জোরালো হয়। তর্ক ছিল, ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আলাপের শুরু বিগত শতকের ষাটের দশকে। ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একপক্ষের মতে, মুদ্রিত পত্রিকার দিন শেষ হলো বলে। অন্যপক্ষের অভিমত, খবরের কাগজের আবেদন কখনও ফুরাবে না। বাস্তবে, টিকবে কি টিকবে না সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সম্প্রচার সাংবাদিকতার সমান্তরালে ছাপা পত্রিকার জনপ্রিয়তা অটুট ছিল। স্বমহিমায় ছিল উদ্ভাসিত। তবে বছর দশেক হলো ছাপা পত্রিকার আগের সেই জৌলুস আর নেই। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পত্রিকার বিদ্যমান বিজ্ঞাপন বাজারের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব আর বিদেশি গণমাধ্যমে। যে অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর এই শিল্প দাঁড়িয়ে সে ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ায় অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন সংবাদমাধ্যমের উদ্যোক্তার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ ব্যবস্থাপক ও সম্পাদকরাও। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দ্রুত উত্থানে পত্রিকার রাজস্ব আয়ে ধস নেমেছে। তবে দেশে বিজ্ঞাপনের বাজার টাকার অংকে কতটা বড় সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য কারো হাতে নেই। এমনকি সরকারের কাছে নেই কোনো পরিসংখ্যান। অবশ্য বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো বলছে, এ বাজার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার। তবে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের বিজ্ঞাপন বাবদ প্রতিবছর কত টাকা ব্যয় করছে সে সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য দিতে আগ্রহ নেই তাদের। এ নিয়ে এক ধরনের রাখঢাক দেখা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসরিন আক্তার বলছেন, বর্তমানে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। তার মতে, সোশ্যাল মিডিয়া এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অনেক বিজ্ঞাপন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসে এবং পরে টেলিভিশনে প্রচার হয়। ফেসবুকে বিজ্ঞাপনের ফিডব্যাক দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তা কতবার কোন মিডিয়াতে প্রচার হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন কোম্পানি এরই মধ্যে বিজ্ঞাপনের জন্য ডিজিটাল বিভাগ খুলেছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন যারা দেয়, তাদের মধ্যে টেলিকম খাত অন্যতম। টেলিকম খাতের একটি সূত্রমতে, প্রতিবছর তাদের সর্বমোট বিজ্ঞাপন বাজেটের ৭০ শতাংশ এখন ডিজিটাল খাতে ব্যয় করা হয়।
গত ১৯৯৭ সালে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রথম টেলিভিশন চ্যানেল এবং ১৯৯৮ সালে কমিউনিটি রেডিও চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যম বলতে কেবল মুদ্রিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীই ছিল। স্বাধীনতার পরে সরকারি এক হিসাবে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল ৩০, অর্ধ সাপ্তাহিকের সংখ্যা তিন এবং সাপ্তাহিকের সংখ্যা ছিল ১৫১টি। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সম্প্রতি সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জানান, বর্তমানে সারা দেশে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা দুই হাজার ৬৫৪টি। এর মধ্যে দৈনিক পত্রিকা এক হাজার ২৪৮, সাপ্তাহিক এক হাজার ১৯২ এবং পাক্ষিক পত্রিকার সংখ্যা ২১৪টি।
এতদিন ধরে ছাপা পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রেডিও-টেলিভিশন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিন নতুন আঙ্গিকে হয়ে উঠেছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। বিজ্ঞাপনদাতারা বিকল্প মাধ্যমের দিকেই ঝুঁকছেন বেশি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে খুব সহজে লাখ লাখ মানুষের কাছে অল্প সময়ে পৌঁছানো সম্ভব বিধায় বিজ্ঞাপনদাতাদের এই বাঁকবদল। বিজ্ঞাপন প্রকাশের বাঁক বদলে বিশ্বের তাবৎ প্রভাবশালী পত্রিকা কয়েক বছর আগে থেকেই জনবল ছাঁটাইয়ের পুরনো পথে হাঁটলেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে মহামারী করোনার অভিঘাতে ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থায় সংবাদমাধ্যমে কর্মী ছাঁটাই আরো বেড়েছে। মহামারী শুরুর ছয় মাসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অসংখ্য সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরি হারিয়েছেন হাজার হাজার সাংবাদিক।
এমন পরিস্থিতিতে বাড়তি আয়ের আশায় একাধিক পথের সন্ধানে মরিয়া ছাপা পত্রিকা। আয় বাড়াতে ই-সংস্করণে মনোযোগী প্রিন্ট মিডিয়া। তবে তাতেও আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য আসছে না। বাধ্য হয়ে সংবাদমাধ্যম বিকল্প পথে এগোচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনের আয়ে নিজস্ব হিস্যা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়; তার একটি অধিকার চায় মূলধারার গণমাধ্যম। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়টার্স ইনস্টিটিউটের একটি সাম্প্রতিক জরিপ থেকেও দেখা গেছে: কোভিড-১৯ বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য ৭৬ শতাংশ সংবাদমাধ্যম ডিজিটাল রূপান্তর পরিকল্পনাকে আরো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাইছে।
বিজ্ঞাপনের বেশির ভাগই যখন গুগল, ফেসবুক ইত্যাদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছে চলে গেছে এবং ক্রমেই আরো বেশি মাত্রায় যাচ্ছে, তখন ভাবা হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের আয়ের প্রধান উৎস হবেন এর পাঠক-দর্শক শ্রোতা। আগামী দিনে সংবাদমাধ্যম নির্ভর করবে নিজস্ব ভোক্তার ওপর, মানে পাঠকই হবে আয়ের প্রধান উৎস। দিন শেষে পাঠক, দর্শক-শ্রোতাই হবেন টিকে থাকার অবলম্বন। এই নমুনা টেকসই হলে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিজ্ঞাপনদাতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ খানিকটা কমবে বলে আশা করা যায়। সে ক্ষেত্রে পাঠকের অধিকার সংরক্ষণে সংবাদমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় যত্নশীল হতে হবে। এতে সাংবাদিকতার গুণগতমানও বাড়বে। সমাজে সাংবাদিকের মর্যাদা মজবুত ভিত পাবে।
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমবিষয়ক আলোচনার ধারা অত্যন্ত দুর্বল। এর মধ্যে গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিষয়ক আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পাঠ্যক্রমে এই বিষয়ের তাত্ত্বিক দিক যতটা আলোচিত হয়, বাস্তবে বিরাজমান অবস্থার তথ্যনির্ভর গবেষণা ততটা হয় না। হলেও সেগুলো সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই প্রতিদিন সংবাদ প্রকাশ করতে হয়। দিন দিন এই চ্যালেঞ্জ কঠিন হচ্ছে। এমন অবস্থার মধ্যেই সংবাদপত্রগুলোর টিকে থাকাকে এক ধরনের অর্জন বলে মনে করছেন মুদ্রিত সংবাদপত্রের সম্পাদক ও শিক্ষাবিদেরা।
সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘৫০ বছরের বাংলাদেশ: গণমাধ্যমের অর্জন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও গণমাধ্যমের অর্জন প্রচুর। যেমন গণমাধ্যম শিল্প হিসেবে মোটামুটি দাঁড়াচ্ছে। যদিও এখনো শিল্প বলা যাবে না। কিন্তু শিল্পের ধারেকাছে পৌঁছার চেষ্টা করছে। যতই এটি শিল্পের মর্যাদায় চলে যাবে, ততই দেখা যাবে তার ভূমিটা শক্ত হবে। সংবাদপত্রের এখনো দুটি সংস্করণ চলছে। মুদ্রিত ও অনলাইন সংস্করণ। অনেকের ধারণা ছিল মুদ্রিত সংবাদপত্রের দিন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা শেষ হয়নি। অনলাইনে সংবাদপত্র দেখা হচ্ছে। তারপর সকালে সংবাদপত্রটিও পড়া হচ্ছে।
আনন্দবাজার/এনএম









