বিশ্বে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় আবারও শীর্ষে উঠে এসেছে ঢাকা। বায়ু মানের সূচকে (একিউআই) ঢাকার অবস্থান ছিল ১৯৭। যা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিটে এই সূচক রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে ১৮৯ একিউআই সূচক নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় ছিল ভারতের দিল্লি। আর ১৮৪ সূচক নিয়ে তালিকার তৃতীয়স্থানে অবস্থান ছিল উত্তর মেসিডোনিয়ার স্কোপজে। তবে শুধু এবারই নয়, এর আগেও কয়েক দফায় বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছিল ঢাকা।
অতিমাত্রায় বায়ুদূষণ সদ্য বিদায়ী বছরে কেড়ে নিয়েছে ৭২০ জনের প্রাণ। পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতি গুণতে হয়েছে ৭৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার। এমন তথ্য উঠে এসেছে ইন্টারন্যাশনাল ওয়েল বিল্ডিং ইনস্টিটিউট কি-স্টোন-আইডব্লিউবিআইয়ের এক প্রতিবেদনে। তবে বায়ুদূষণে বিশ্বজুড়ে সবসময়ই আলোচনায় রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। গেল কয়েক বছরে মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে গ্যাস চেম্বার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজধানী শহরটি।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে বায়ুদূষণের কারণে বিগত ২০১৯ সালে ১৭ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আতশবাজি পোড়ানো ছাড়াও দিল্লির লাগোয়া পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যের কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলার কারণে দিল্লির বায়ুদূষণ ভয়াবহ মাত্রা পায়। পরিস্থিতিকে তখন ‘গ্যাস চেম্বার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সে বছরে দুই কোটি মানুষের শহর দিল্লির সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
এ ব্যাপারে ভারতের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের বিশ্লেষক সুনীল দাহিয়ার মূল্যায়ন হলো, আতশবাজি পোড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কাজে আসেনি। বায়ুদূষণের অন্য উৎসের পাশাপাশি এই আতশবাজি পোড়ানোই বিপজ্জনক মাত্রায় দূষণ ডেকে এনেছে বলে তার ধারণা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের ১৬ নম্বরে ছিলো মানিকগঞ্জ। এ ছাড়া শীর্ষ ১০০ দূষিত শহরের মধ্যে ঢাকা ও গাজীপুরের শ্রীপুর ছিল। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সূচক অনুযায়ী সবচেয়ে দূষিত ১০০ শহরের মধ্যে ৪৬টির অবস্থানই ভারতে। এরপর ৪২টি শহর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল চীন। তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তানের ছয়টি শহর। আর চারটি দূষিত শহর বা অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৪ নম্বরে। তবে বিগত সময়ের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরের মধ্যে ঢাকা আর গ্যাস চেম্বারখ্যাত দিল্লির নামই বার বার উঠে আসছে।
কোন অঞ্চলের বায়ু কতটা দূষিত তা নির্ধারণ করা হয় পিএম ২.৫, পিএম ১০, ওজোন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন মনো-অক্সাইডের মাত্রার ওপর। বায়ুদূষণের উপাদান অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম) মানবশরীরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর মাত্রা ১২-এর নিচে হলে তা ক্ষতিকর নয় বলে বিবেচনা করা হয়। ৫৫ থেকে ১৫০ মাত্রাকে অস্বাস্থ্যকর এবং ২৫০ এর বেশি মাত্রাকে বিপজ্জনক বলা হয়ে থাকে।
তবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (বায়ুমান সূচক) একিউআই অনুযায়ী, স্বাভাবিক দূষণের মাত্রা ৫০ থাকলেও রাজধানী ঢাকার মাত্রা অনেক বেশি। বাংলাদেশে একিউআই নির্ধারণ করা হয় দূষণের পাঁচটি ধরনকে ভিত্তি করে- বস্তুকণা (পিএম১০ ও পিএম২.৫), এনও২, সিও, এসও২ এবং ওজোন (ও৩)। একিউআই সূচক ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে হলে নগরবাসীর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একিউআই সূচক ২০১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে হলে স্বাস্থ্য সতর্কতাসহ তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। একিউআই সূচক ৩০১ থেকে ৫০০ বা তারও বেশি হলে বাতাসের মান ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’ একিউআই অনুযায়ী ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বায়ুমান দূষণের সূচকে প্রথম স্থানে উঠে আসে। এদিন দূষণের মানমাত্রা ছিল ৩১৫। সেদিন কলকাতা ১৮৬ মান নিয়ে তৃতীয়। মুম্বাইয়ে ১৬৯ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল।
ঢাকার বায়ুমান দূষণে বিশ্বের শীর্ষে চলে এসেছে। এ বিষয়ে পরিবেশ উন্নয়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কী পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার এমপি বলেন, মন্ত্রী থাকতে আমাকে কেন প্রশ্ন করছেন? আমি কথা বলতে পারবো না। আমার দায়িত্ব অনেক নিচে। আমার ওপর অনেকে আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলুন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, বিশ্বের বায়ুদূষিত শহরের মধ্যে সাংহাই ও মেক্সিকো শীর্ষে। ঢাকার বিষয় নিয়ে কারা গবেষণা করেছে আমরা জানি না। তবে আমরা এটি উন্নতকরণে কাজ করছি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, পরিবেশের সঙ্গে আমরা প্রত্যেকেই জড়িত। সবাইকে নিজ নিজ পক্ষ থেকে সচেতন হতে হবে। নিজের দায়িত্বটুকু যথাযথভাবে পালন করতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক, দুই সিটি করপোরেশনসহ যারা কাজ করছে সবাইকে পরিবেশসম্মত কাজ করতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠিপত্র দিয়েছি। তবে তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ কাজ করে গেলেও কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হতে পারছি না। এক্ষেত্রে বিজ্ঞজনরা পরামর্শ দিলে আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করবো। ২০২০ সালে হাইকোর্ট পরিবেশ নিয়ে গাইডলাইন তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিল। সেটি করে স্টেকহোল্ডারদের দেয়া হয়েছে।
বিগত ২০১৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার বায়ু দূষণের তিনটি প্রধান উৎস হল- ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণ সাইটের ধুলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। ডব্লিউএইচওর নির্ধারণ করা দূষণের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া এলাকায় বাস করে বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ। বায়ুদূষণের সঙ্গে হাঁপানি, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। একই বছরের ২৮ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ বন্ধে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলের পাশাপাশি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশও দেন। এরপর ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা পরিমাপ করে এবং দূষণ রোধে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদন আকারে দাখিল করতে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়।
আনন্দবাজার/শহক









