- রাঙ্গাবালিতে রাতে থাকেনা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
- মিলেছে পাঁচ একর ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদন
- সাগর-নদী ঘেরা উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ৯ বছর আগে
শ্বাসকষ্ট কমে না। এইহানে আইলে বড় ডাক্তার দেখাইতে কয়। কিন্তু হেইয়া দেহাইতে শহরে যাওয়া লাগে। গরিব মানুষ। কেমনে শহরে যাই। এইহানে বড় ডাক্তার দিলে আমাগো মতন গরিবের উপকার হইবে।’ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা নিতে এসে অশ্রু শিক্ত নয়নে এ কথা বলেন সদর ইউনিয়নের পশুরবুনিয়া গ্রামের হালিমা জাহান (৩২)।
তথ্যমতে, এ দ্বীপে হাসপাতাল নেই। তাই অ্যাম্বুলেন্সও নেই। নেই নিয়মিত এমবিবিএস ডাক্তার। উপজেলার নাম ‘রাঙ্গাবালী’। সাগর ও নদী ঘেরা এ উপজেলার যাত্রা শুরু হয় ৯ বছর আগে। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। তবে তাদের চিকিৎসা সেবার জন্য দীর্ঘদিনেও একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ হয়নি এখনও। উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, জরুরীভিত্তিতে এখানে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা প্রয়োজন।স্থানীয়রা
জানান, উপজেলা ঘোষণা হলেও রাঙ্গাবালীতে এখনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হয়নি। এখানকার রোগীদের বাধ্য হয়েই যেতে হয় পার্শ্ববর্তী গলাচিপা, কলাপাড়া কিংবা জেলা শহর পটুয়াখালীতে। তবে অসহায় মানুষের পক্ষে এত দূরে গিয়ে চিকিৎসা করানো কষ্টসাধ্য। নিয়তির উপর ভর করে গ্রাম্য ডাক্তার, কবিরাজ ও ঝাড়-ফুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের। পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এ দ্বীপের অবস্থান। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উত্তরে আগুনমুখা নদী, পূর্বে বুড়াগৌরাঙ্গ ও পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী বেষ্টিত দ্বীপ রাঙ্গাবালী ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনও রাঙ্গাবালীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হয়নি। পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে উপজেলাটি।
জানা গেছে, ২০১১ সালের হিসেব অনুযায়ী রাঙ্গাবালী উপজেলায় মোট জনসংখ্যা এক লাখ ৯ হাজার ৩১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫৫ হাজার ৩৯৩ এবং মহিলা ৫৩ হাজার ৯১৯ জন। এছাড়াও ৫ বছর পর্যন্ত বয়সী ১৪ হাজার ৪৫৬ শিশু রয়েছে এ উপজেলায়। তবে বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় দুই লক্ষ। এখানে চিকিৎসা সেবার জন্য চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এ পাঁচটি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে পাঁচজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও আছেন তিন জন। তবে বর্তমানে তিনজনই গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অবস্থান করছেন। অপরদিকে চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র লোকবল না থাকায় বন্ধ রয়েছে। অপর তিনটি রাঙ্গাবালী সদর, ছোটবাইশদিয়া ও চরমোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৬ জন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্বাস্থ্য সহকারী) থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন চারজন। এর মধ্যে রাঙ্গাবালী সদরে দুইজন। অপরদুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুই জন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, উপজেলায় ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায়।
সম্প্রতি রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা দিচ্ছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘এ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৬০ জন থেকে ৭০ জন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে রোগী আসছেন। গর্ভবতী মায়েরাও আসেন। তাদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এখানে দুইজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন পরিবার কল্যাণ পরির্দশিকা ও দুই জন এলএমএসএস রয়েছেন। তবে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী কিংবা মুমূর্ষ রোগী আসলে গলাচিপা ও পটুয়াখালী রেফার করা হয়।’
ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা সেনের হাওলা গ্রামের কুলসুম আরা (৬৮) বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। ছেলে অন্যত্র চলে গেছে। মানুষের বাড়িতে গিয়ে এখন আর কাজ করতে পারেন না তিনি। কয়েকদিন ধরে জ্বর-শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাকেও চিকিৎসার জন্য গলাচিপা যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু অর্থাভাবে যেতে পারছেন না তিনি।’
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, ‘চিকিৎসক পোস্টিং হয় বর্হিবিভাগ ভিত্তিক। রাতে থাকার কোন ব্যবস্থা না থাকায় রাঙ্গাবালীর চিকিৎসকদের গলাচিপাতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া রাঙ্গাবালী উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম গলাচিপা উপজেলা থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে রাঙ্গাবালীর রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে গলাচিপাতে আসছে এবং এখানে তারা সেবা পাচ্ছেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। ভ‚মি অধিগ্রহণ শেষে কমপ্লেক্স ভবণ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের এমপি মহিব্বুর রহমান মহিব বলেন, ‘রাঙ্গাবালীতে হাসপাতাল অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। কারণ প্রত্যেকটি উপজেলায় হাসপাতাল থাকা সরকারি বিধিবিধানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত । কিন্তু যথাযথ প্রচেষ্টার অভাবে এতদিন হয়নি। আমি এমপি হওয়ার পর ডিও লেটার নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে গিয়েছি। তিনি ডিও লেটারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখে দিয়েছেন। ইতোমধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিগগরই পরিপূর্ণ হাসপাতাল নির্মাণকাজ দেখতে পারবে এলাকাবাসী।’
আনন্দবাজার/এম.আর









