বর্তমান পুঁজিবাজার আজব পথে হাঁটছে। লেনদেনে রয়েছে অস্বাভাবিক আচরন। ছন্দ ছাড়া চলছে পতন। এতে এক-দুই শতাংশ অর্থ লোভি বিনিয়োগকারী লাভবান হচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে। কিন্তু বাকী নিরীহ বিনিয়োগকারী অর্থ হারাচ্ছে বলে জানান পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। ২০১০ সালের বড় ধসের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুঁজিবাজারের উন্নয়নে দিয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। ছিল আর্থিক প্রণোদনাও। দীঘসময় ধরের দফায় দফায় করেছে আলোচনা। শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়তে দিয়েছে দিক নির্দেশনা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সব চেষ্টা চলে যাচ্ছে জলে এমটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নীরবে কাঁদছেন জানিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে বড় ধস (২০১০ সাল) বিনিয়োগকারীদের অনেক কাঁদিয়েছে। অনেকেই কষ্টে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ধসের ১১ বছর পর এখনও বিনিয়োগকারী কাঁদছে। পুঁজিবাজারে বিভিন্ন উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সুফল নেই। কেন নেই, পুঁজিবাজার রেগুলেটরদের কাছে নাই তার ব্যাখা।
বিভিন্ন অনিয়ম প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এসব কারণেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। শিগগিরই এসব বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অনিয়ম বন্ধে রেগুলেটদের আরও শক্ত অবস্থান থাকতে হবে। পাশাপাশি জড়িতদেরও ধরতে হবে। চলতি বছরের শুরু দিকে লেনদেন দৈনিক দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল, সেই উত্থান সময়ে বিএসইসি কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদ বলেছে, পুঁজিবাজারে দৈনিক লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকার ঘরে নিয়ে যেতে চায় বিএসইসি।
সেই সময়ে বিএসইর পক্ষ থেকে বলা হয়, পুঁজিবাজার আকার অনেক বড় হচ্ছে। গভীরতা বেড়েছে। পূর্বের চেয়ে পুঁজিবাজার অনেক স্মাট। তারল্য সমস্যাও নেই। তাই দৈনিক দেড় হাজার কোটি টাকা লেনদেন সামান্য। এটি আরো বাড়বে। সামনে লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকা ওপরে যাবে। ডিএসইর প্রধান সূচক সূচকও ৯ হাজার পয়েন্টে ওপরে যাবে। কিন্তু তাদের সেই আশা, এখন মিথ্যায় রুপ নিয়েছে। লেনদেন বর্তমানে ৫শ কোটি টাকার ঘরে গড়াগড়ি করছে। পতন সব ধরনের সূচক। কমেছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর।
বিভিন্ন অনিয়ম প্রতিরোধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অনিয়মের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেবে না বিএসইসি বলেও জানান। আবার পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সব ধরনের অনিয়ম রোধে বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান।
এরই ধারায় গত সোমবার অভিনব পন্থায় শেয়ার দর কমানোর লক্ষ্যে পুঁজিবাজারের ৯ ব্রোকারেজ হাউসের ১৫ জন ট্রেডার জড়িত বলে প্রমাণ পায় বিএসইসি। তাই আইন লঙ্ঘনের দায়ে ওইসব ট্রেডারদের লেনদেন কার্যক্রম থেকে সাসপেন্ড করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। এই বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে অভিযুক্ত ট্রেডারদের ব্যাখ্যাও চায় বিএসইসি।
পুঁজিবাজার খুবই স্পর্শকাতক মন্তব্যে করে বিজ্ঞ বিনিয়োগকারী মনিরুজ্জামান বলেন, পুঁজিবাজার সবার জন্য নয়। এখানে বিনিয়োগ আগেই পর্যাপ্ত জ্ঞান নিয়ে আসতে হবে। কারন এখানে বিভিন্ন বিষধর বিনিয়োগকারী রয়েছে। যারা দেখতে সুট প্যান্ট পড়া ভদ্রলোক। শিক্ষিত, চতুর এবং মিষ্টিভাষী। অর্থ হাতিয়ে নিতে রয়েছে তাদের নানান কৌশল। জায়গা জায়গায় রয়েছে তাদের ফাঁদ। এরা আপনার সামান্য ভূলে নি:স্ব করবে। কিছুই বলতে পারবেন না। কারন আইনের ফাঁক ফোকর জানে। তাই পুঁজিবাজারে জেনে, বুঝে শুনে ও বিশ্লেষন করে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেন বিজ্ঞ এই বিনিয়োগকারী।
মাত্র ১৯ দিনে ২২ শতাংশ পুঁজি হারিয়েছি জানিয়ে স্কয়ার সিকিউরিটিজ হাউজের বিনিয়োগকারী পারভেজ আলী বলেন, ২০১০ সালের ধস দেখেছি। এরপর ছোট ছোট অনেক পতন দেখেছি। প্রতি পতন পর ভাবি পুঁজিবাজার ভাল হয়ে যাবে। উন্ননের ধারা দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু না, আমি ভূল বকছি।
চলতি বছরে শুরুতে পুঁজিবাজারে সুবাতাশ ছিল জানিয়ে পারভেজ আলী বলেন, সেই সময় লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। সূচকেও উর্ধ্বমুখী। ভাবিনি সেই লেনদেন পাঁচশ কোটি টাকায় গড়াগড়ি করবে। সূচকও থাকবে নিম্নমুখী। মাত্র ১৯ দিনের মন্দায় আমার ২ লাখ টাকা নাই হয়ে গেছে। যা বিনেয়াগের ২২ শতাংশ।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সবুজ সিগন্যাল রেগুলেটরদের (বিএসইসি) এমন আশ্বাসে পুঁজিবাজারে এসেছি জানিয়ে লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজ হাইজের বিনিয়োগকারী মামুন রশিদ বলেন, কিন্তু এসে দেখছি অন্যটা। পুঁজিবাজারের অন্য রুপে। মাত্র কয়েদিনেই পুঁজি হারিয়েছি ১০ শতাংশ। এখানে বিশ্লেষন বিনিয়োগের কেউ ধার ধারেনা। বিনিয়োগ চলে গুজব ও কান কথায়।
এক মাসের পতনে ১৮ শতাংশ পুঁজি হারিয়ে আরেক বিনিয়োগকারী হমায়ুন কবীর বলেন, কষ্টে দিন কাঁটাচ্ছি। ছেলে মেয়েকে নিয়ে ঠিকমতো ঈদে করতে পারবো কিনা বুঝতে পারছি না। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী আইটেমে পিছনে ছুটে জানিয়ে হমায়ুন কবীর বলেন, আইটেম তথ্য ছড়ানোর কাজে সিকিউরিটিজ হাউজ, রেগুলেটর সহ বেশকিছু কর্তা কাজ করছে। তাই স্বাভাবিক পুঁজিবাজার দেখতে শিগগিরই এটি বন্ধ করতে হবে বিএসইর চেয়ারম্যানকে।
বিভিন্ন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে পতন জানিয়ে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মন্দার প্রথমে রয়েছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা। বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে টানপোড়ন চলছে। রয়েছে তারল্য সমস্যা। এছাড়া ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ। আইপিও অনুমোদন পতন বৃত্ত বড় করছে জানিয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক করতে আইপিও বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে স্মল ক্যাপিটাল মার্কেট (এসএমই) অনুমোদন আপাতন বন্ধ রাখতে হবে।
অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার কারণে অস্থির হয়ে পড়ছে পুঁজিবাজারের সিকিউরিটিজ হাউজগুলো। সামান্য ভুলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুক্ষ্মভাবে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানান পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বেশকিছু চক্র নীরবে এসব কাজ করে যাচ্ছে। তারা রেগুলেটর, স্টক এক্সচেঞ্জসহ সিকিউরিটিজ হাউজের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে। চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তবে পুঁজিবাজারকে অস্থির করে তোলা নীরবে কাজ করে যাওয়া সেই চক্রকে ঠেকাতে নানা উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
ঢাকা স্টক এক্সছেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলছেন, অনিয়ম রোধে ডিএসই খুবই সতর্ক। অনিয়ম হলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান করছি। সমস্যার সমাধান করছি। তবে পুঁজিবাজারে যারা বিনিয়োগ করছেন তাদের অনেক সতর্ক থাকতে হবে। অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে সম্প্রতি উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আব্দুল লতিফকে ডিএসইর প্রধান রেগুলেটরি কর্মকর্তার (সিআরও) পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি, প্রতিদিনের লেনদেনের তথ্য বাইরে প্রচার, বেশকিছু হাউজের বড় অনিয়মসহ ডিএসইর কিছু সদস্যকে অনৈতিক সুবিধার অভিযোগ রয়েছে।
ডিএসইর এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আব্দুল লতিফের দুর্বল মনিটরিং ও নিজের স্বার্থ হাসিল করার কারণেই কয়েকটি ব্রোকারেজে বড় ধরনের অনিয়ম দিয়েছিল। বানকো সিকিউরিটিজে ডিএসই তদন্ত করে বিনিয়োগকারীদের হিসেবে ২০ কোটি বেশি দেখেছিলো। পরবর্তীতে বিএসইসির নির্দেশে তদন্ত করলে সেখানে ৬৬ কোটি টাকা নেগেটিভ পাওয়া যায়। এ অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় ডিএসই। এছাড়া ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, মডার্ন সিকিউরিটিজসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম পেয়েছিল ডিএসই।
আনন্দবাজার/শহক









