- লোকসান গুনতে হচ্ছে পেঁয়াজ চাষিদের
- এভাবে দাম কমলে সামনের বছরে আর পেঁয়াজের চাষ করব না: পেঁয়াজ চাষি
গেল বার পেয়াঁজের দাম বাড়ায় এবার কুষ্টিয়ায় বেশি পরিমাণে গুরুত্ব দিয়ে জমিতে যত্ম সহকারে পেঁয়াজ চাষ করেছে জেলার বিভিন্ন উপজেলার চাষিরা। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় চাষিরা ব্যাপকহারে পেঁয়াজ রোপণ করেছে। তবে গেলো মৌসুমে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, তেলের মূল্য বেশি হওয়ায় সেচের মূল্য বৃদ্ধি এবং পেঁয়াজের মাটি প্রস্তুতে খরচ বেশি। সে তুলনায় পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় চাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
পেঁয়াজ চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে তাদের খরচ হয়েছে ২৫-৩৫ হাজার টাকা। আর পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২০-৩০ হাজার টাকা। কৃষকদের দাবি, দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ হয় তা দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাই সরকারের উচিত ভারতের পেঁয়াজ আমদানি না করা।
কুষ্টিয়ার সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের বাজার বাঁশগ্রাম। সেখানে গত শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, ভালো পেঁয়াজ ৬শ টাকা থেকে ৯শ টাকা মণ। এবং ছোট ও ফাটা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে তিনশো টাকা থেকে সাড়ে ৫শ টাকা মন হিসেবে। একেতো তপ্ত দুপুরে কৃষকেরা ক্লান্ত আবার অন্যদিকে দাম না পেয়ে মুষড়ে পড়েছে হাটে আনা আশপাশ এলাকার পেঁয়াজ চাষীরা।
হাটে আসা পান্টি ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, এবার পেঁয়াজ চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছে। ভালো দাম পায়নি। হিসেব নিকেশ করে লোকসান হচ্ছে আমাদের। এরজন্য ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে আসছে বলে আমাদের পেঁয়াজের দাম নেই। ২০ মণ পেঁয়াজ এনেছিলাম। ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। অন্তত পনেরোশ থেকে দুই হাজার টাকা মণ বিক্রি করতে পারলে বেশ লাভ হতো। এভাবে পেঁয়াজের দাম কম হলে সামনের বছর আর পেঁয়াজের চাষ করব না। একই সাথে সরকারের দাম বাড়ানো উচিত বলেও জানান এই চাষী।
বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রামের কৃষক তফিজ উদ্দিন বলেন, ‘চাষের খরচ মেটাতে ১০ মণ পেঁয়াজ হাটে এনেছি। কেউ ৭০০, টাকা আবার কেউরা ৮০০ টাকা মণ বলছেন। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি করতে পারলে আপাতত খরচটা মেকআপ হতো।’
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কুসলীবাসা গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, এবছর দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলাম। তাহেরপুরী জাতের খোলা বীজ সতেরশ টাকা কেজি হিসেবে কিনে দুই কেজি চারা রোপন করে পেঁয়াজের আবাদ করেছি। বিঘা প্রতি ৫০ মণ ফলন হওয়ার কথা থাকলেও দুই বিঘা জমিতে ৮৫ মণ পেঁয়াজ পেয়েছি। এরমধ্যে ৬০ মণ ভালো পেঁয়াজ এবং ২৫ মণ ফাটা পেঁয়াজ পেয়েছি।
সব মিলিয়ে ৫৮ হাজার টাকার মতো বিক্রি করেছি। কিন্তু আমার খরচ হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করে যদি দুই হাজার টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা যেতো তাহলে আমার মতো অনেক কৃষকরা বাঁচতো।
কুষ্টিয়া জিয়ারখী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া গ্রামের চাষি মোহর আলী বলেন আমি ৩ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। তবে খরচের চেয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করে তেমন লাভ হচ্ছেনা। বর্তমান বাজারে পেঁয়াজ ৬’শ থেকে ৮’শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এ বছর পেঁয়াজের যে দাম আগে জানলে পেঁয়াজ রোপণ করতাম না।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পারমৃত্তিকাপাড়া এলাকার কৃষক বদর উদ্দিন বলেন, ১০ মণ পেঁয়াজ বিক্রির জন্য বাঁশগ্রাম হাটে এনেছিলাম। কিন্তু ভালো দাম নাই বলে পেঁয়াজ ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারের উচিত ভারতের এলসি পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করা। তাহলেই কেবল কৃষক অন্তত ন্যায্যমূল্য পাবে।
বাঁশগ্রামহাটে আসা ব্যাপারী রফিকুল ইসলাম মিয়া কুমিল্লা থেকে এসেছেন। এই বাজারে পেঁয়াজের দামে তিনি বেশ খুশি। তিনি বলেন, ‘এক ট্রাক পেঁয়াজ কিনেছি। প্রায় ৪৫০ মণ হবে। মণপ্রতি ৬০০-৮০০ টাকা করে কিনতে পেরেছি। এই এলাকার পেঁয়াজের মান বেশ ভালো উল্লেখ করে এই পেঁয়াজ ব্যবাসায়ী বলেন, এই এলাকার পেঁয়াজ খুবই ভালো। একটু দেখে শুনে কিনতে পারলেই বেশ। তাছাড়া এই এলাকায় পেঁয়াজ উৎপাদন বেশি হওয়ায় এখন পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম কম।
বাঁশগ্রাম আলাউদ্দিন কলেজ মাঠ পেঁয়াজের হাট ইজারাদার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন পেঁয়াজের হাটে উঠেছে। আকার ও মানভেদে সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকা মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। দামে ব্যবসায়ীরা বেশ খুশি হলেও কৃষকেরা হতাশ। তবে আস্তে আস্তে পেঁয়াজের দাম বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় তাহেরপুরী, বারী পেঁয়াজ-১, কিংসুপার ও মেটাল এই চার জাতের পেঁয়াজ কৃষকেরা রোপণ করছে। চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৯১০ হেক্টর জমি, সেখানে অর্জিত হয়েছে ১২ হাজার ৪১৯ হেক্টর জমি। এর মধ্যে পেঁয়াজ মুলকাটা ৩ হাজার ২৯৯ হেক্টর ও চারা রোপণ পেঁয়াজ ৯ হাজার১২০ হেক্টর। কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫৪০ হেক্টর, খোকসা উপজেলায় ৩ হাজার ২৭৭ হেক্টর, কুমারখালী উপজেলায় ৪ হাজার ২৫৫ হেক্টর, মিরপুর উপজেলায় ৩৭০ হেক্টর, ভেড়ামারা উপজেলায় ২৩৫ হেক্টর ও দৌলতপুর উপজেলায় ২ হাজার ৭৪২ হেক্টর।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) বিষ্ণু পদ সাহা জানান, পেঁয়াজ চাষিদের অর্থকারী ফসলের মধ্যে অন্যতম। এ অঞ্চলের মাটি পেঁয়াজ চাষে উপযোগী। এ জন্য আমরা সবসময় কৃষকদের পেঁয়াজ চাষে পরামর্শ দিয়ে আসছি। তিনি জানান, জেলার খোকসা, কুমারখালী ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়েছে। কৃষকেরা পেঁয়াজ মাঠ থেকে তুলেই সবাই একসাথে বাজারে আনছে যার কারনে দামটা একটু কম। কৃষকের নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করে কিছুদিন রাখলেই আবার পেঁয়াজের দাম বাড়বে।
আনন্দবাজার/শহক









