প্রতিবছর রমজান আসতেই অস্থির হয়ে ওঠে নিত্যপণ্যের বাজার। হঠাৎ করেই চড়ে যায় দাম। সবজি থেকে শুরু করে রোজায় অপরিহার্য পণ্যের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ে রাজধানীতে। চাষিরা যেসব নিত্যপণ্য উৎপাদন করে স্থানীয় বাজারে তার যে দাম দেখা যায় রাজধানীতে বাজারে সেগুলোই চার পাঁচগুণ হয়ে যায়। দাম বাড়া শুরু হয় মূলত জেলা শহর থেকে।
চাষিরা ফসলের মাঠ থেকে সবজি বা পণ্য তুলে নিয়ে যান স্থানীয় বাজারে। সেখানে যে দামে বিক্রি করেন, সেটাই উৎপাদিত পণ্যের আসল দাম। যেটা সরাসরি উৎপাদক পেয়ে থাকেন। এরপর যতই হাত আর স্থান বদল হতে থাকে ততই বাড়তে থাকে দাম। রোজার অপরিহার্য উপকরণ বেগুনের দামে বেশি উল্লম্ফন দেখা যায়। চাষিরা ক্ষেত থেকে বেগুন তুলে প্রতি কেজি বিক্রি করেন ১০ থেকে ১৫ টাকা। আর সেই বেগুন শহরের ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছে দাম গিয়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকা কেজিতে। মাঝখানে পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে শহরের পাইকারী বিক্রেতাসহ মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা এই মুনাফা ভোগ করেন।
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে যে দামে বিক্রি করছেন, রাজধানী পর্যন্ত এসে সেই পণ্যের দাম চারগুণ বাড়ছে। মাঝখানে পরিবহন বাবদ যে খরচ হচ্ছে তা সামান্যই। অথচ শুধু রাজধানীর বাজারে এসেই দাম চড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর বাইরে দুশ থেকে তিনশ কিলোমিটার দূরের জেলা থেকে যেসব পণ্য রাজধানীতে আসছে সেসব পণ্যের গড় পরিবহন খরচ কেজিতে মাত্র ২-৩ টাকা পর্যন্ত। অথচ সেই খরচের দোহায় দিয়ে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা বা উপজেলা শহরেরর পাইকারীতে যে ঢ্যাঁড়স প্রতি কেজি ২২ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে কেনা হয়েছে কারওয়ান বাজারে তার দাম বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা। আবার খানিকটা দূরে হাতিরপুলের বাজারে সেই ঢ্যাঁড়সই আবার বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে। একইভাবে জেলা থেকে ১৪-১৫ টাকা কেজি দরের পেঁপে কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকা কেজিতে। ১৮-২০ টাকার লাউ রাজধানীর বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা দরে। ৩৮-৪০ টাকা কেজির কচুর লতি বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা দরে। প্রায় সব ধরনের সবজির দামও একই হারে বেড়ে যায়।
অনেকেই বলছেন, রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজির কারণে দাম বেড়ে যায় পণ্যের। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, সব ধরনের চাঁদার হিসাব পণ্যের দরের সঙ্গে যোগ করলেও তা এতটা হওয়ার কথা নয়। তাহলে কেন রাজধানীর বাজারে এলেই সবজির দাম তিন চারগুণ বেড়ে যায়- তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, বেশি দাম দিয়ে কেনার কারণে তারা বেশি দামে বিক্রি করেন। আবার পাইকারীরা বলেন, আনা নেয়ার খরচ বেশি হওয়ায় দাম বেড়ে যায়। তবে রাজধানীর বাজারগুলোতে এসেই পণ্যের চারগুণ বাড়ানোর পেছনে কারা জড়িত তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই কারো কাছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ কাঁচাবাজার কারওয়ানবাজারে সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো ঠেকাতে ও বাজার নিয়ন্ত্রণে বুধবার মধ্যরাতে আকস্মিক অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে পাইকাররা মৌখিকভাবে পাইকারি দাম বললেও কেউই পণ্য কেনার কোনো রশিদ দেখাতে পারেনি।
লেবু রমজানে একিটি অত্যাবশকীয় কৃষিপণ্য। ইফতারির সময় লেবুর প্রয়োজন পড়ে সব ঘরেই। সেই লেবু বছরের অন্যান্য সময় পাঁচ টাকা পিস পাওয়া গেলেও রমজানে কমপক্ষে ১০ টাকায় পৌঁছে। এবার রমজানে লেবুর হালি ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় রাত ১২টার দিকে প্রথমে অভিযান চালানো হয় লেবু বহনকারী ট্রাকে।
ট্রাক চালকরা ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, কৃষকের কাছ থেকে প্রতি বস্তা লেবু আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় কেনা হয়। প্রতি বস্তায় লেবু থাকে ৭০০ থেকে ৮০০ পিস। সব খরচ মিলিয়ে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি পিস লেবু কেনায় খরচ হয় সাড়ে তিন থেকে চার টাকা। এরপর ভোক্তা পর্যায়ে এই লেবুর দাম ওঠে ১০ থেকে ১৫ টাকায়।
বেগুনের আড়তে অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, পাইকাররা প্রতি কেজি বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করছেন। এর পর রাত দেড়টায় অভিযান চালে তরমুজের আড়তে। সেখানে দেখা গেছে, পাইকাররা কৃষকের কাছ থেকে ৯ থেকে ১০ কেজি ওজনের একশ পিস তরমুজ কিনছেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায়। সেই তরমুজ তারা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন ৩৫ হাজার টাকা। খুচরা পর্যায়ে প্রতি পিস তরমুজের দাম পড়বে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কারণে কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। এ ধননের অভিযান রাজধানীর অন্য আড়তগুলোতেও চলবে বলে জানান ভোক্তা অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার।
আনন্দবাজার/শহক









