১৭ হাসপাতালে গড়ে শব্দমাত্রা ৮১.৭ ডেসিবল
- ব্যস্ত সড়কের পাশেই বেশিরভাগ হাসপাতাল
- শিশুরা হচ্ছে অমনযোগী, বাড়ছে অরুচি
- ঘুমহীনতার পাশাপাশি খিটখিটে হচ্ছে মেজাজ
শব্দ দূষণ বিধিমালা অনুযায়ী হাসপাতাল এলাকাকে নীরব এলাকা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ১৭টি হাসপাতালের সামনে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে মিলেছে বিপরীত চিত্র। ১৭টি হাসপাতালের সামনের রাস্তায় শব্দ দূষণের মাত্রা সর্বনিম্ন ৬৯.৭ ডেসিবল এবং সর্বোচ্চ ৮৯.৯ ডেসিবল পর্যন্ত পাওয়া গেছে। প্রতিটি স্থানে শব্দের মাত্রা গড়ে ৮১.৭ ডেসিবল পাওয়া গেছে। যেখানে নীরব এলাকার জন্য আদর্শ মান দিনের বেলায় ৫০ ডেসিবল হওয়ার কথা ছিল।
গতকাল বৃহস্পতিবার বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এবং ইকিউএমএস কনসালটিং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে জুম অনলাইন প্লাটফর্মে ‘প্রাণ প্রকৃতির ওপর শব্দ দূষণের প্রভাব ও প্রতিকার’ বিষয়ক ওয়েবিনানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) ১০ সদস্যের একটি গবেষক দল এসব তথ্য তুলে এনছেন। এমাসে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ব্যবহারের ভিত্তিতে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ক্যাপস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার।
গবেষণায় বলা হয়, প্রতিটি হাসপাতালের সামনে শুধুমাত্র কর্মদিবসে মোট ১ ঘণ্টার শব্দের উপাত্ত তাইওয়ানে স্বয়ংক্রিয় সাউন্ড লেভেল মেশিনের সাহায্যে রেকর্ড করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সামনে শব্দের মান ছিল ২৬.৭ শতাংশ (৬৯.৭ ডেসিবল); যা ১৭টি স্থানের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে ৬৩ শতাংশ (৮৯.৯ ডেসিবল); যা ১৭টি স্থানের মধ্যে সর্বোচ্চ। এদের মধ্যে ৯টি স্থানেই ৮০ ডেসিবলের উপরে শব্দের মাত্রা রয়েছে।
শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকার জন্য দিনের বেলায় নির্ধারিত আদর্শ মান মাত্রার (৫৫ ডেসিবল) সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১৭টি স্থানেই আদর্শ মান (৫৫ ডেসিবল) অতিক্রান্ত হয়েছে। আমেরিকান স্পিস অ্যান্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্য অনুযায়ী ৭১ থেকে ৯০ ডেসিবল মাত্রায় শব্দ তীব্রতর শব্দদূষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, ধানমন্ডি এলাকায় অবস্থিত হাসপাতাল গুলোর বেশির ভাগই ব্যস্ততম ট্রাফিক সংযোগ এর পাশে অবস্থিত।
শব্দ দূষণের ক্ষতি
শ্রবণ ব্যধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নাসিমা খাতুন তার বক্তব্যে বলেন, মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর শব্দ দূষণের বিশেষ প্রভাবটি হলো শ্রবণ শক্তি হ্রাস। স্কুলগামী শিশুদের ওপর শব্দ দূষণের প্রভাব বেশি। বর্তমানে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে ক্লাস করার জন্য তারা ইয়ারফোন ব্যবহার করে পাশাপাশি অতিরিক্ত গান-বাজনা ইত্যাদি শুনছে। ফলে পড়াশোনায় অমনোযোগিতা দেখা দিচ্ছে এবং তাদের খাবারে অরুচি সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. রাশিদা বেগম তার বক্ত্যবে বলেন, মাত্রাতিরিক্ত শব্দের ফলে গর্ভপাত হতে পারে এমনকি গর্ভের শিশু জন্মের পর বধির হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি আরও বলেন, উচ্চ শব্দের হর্ন আমদানি ও অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো রোধে সরকারের আইন প্রয়োগ শব্দ দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, আগামী প্রজন্ম বধির হয়ে যেতে পারে। তাদের রক্ষায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই সঙ্গে সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ব্যাপারে তরুণরা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউএসএইড ও এফসিডও-এর বায়ু ও শব্দ দূষণ প্রকল্পের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ার নাছির আহম্মেদ পাটোয়ারী বলেন, অতিরিক্ত শব্দের ফলে যারা সড়কের পাশে কাজ করে থাকেন তাদের শ্রবণ শক্তি কমে যায়। ফলে রাতে ভালো ঘুম হয় না, মেজাজ খিটখিটে থাকে ও কাজে অমনোযোগী দেখা দেয়।
১০ দফা সুপারিশ
অনুষ্ঠান থেকে শব্দ দূষণ রোধে ১০ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধার হয়। এগুলো হলো-
১. শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-এর শতভাগ বাস্তবায়ন। বিশেষ করে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের হর্ন না বাজানোর জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২. বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের আওতায় পরিবেশ ক্যাডার ও পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ দিতে হবে।
৩. বিধিমালা সংজ্ঞা অনুযায়ী চিহ্নিত জোনসমূহে (নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র) সাইনপোস্ট উপস্থাপন ও তা মানার ব্যাপারে নিয়মিত মনিটরিং করা।
৪. ৯৯৯-এ কল সার্ভিসের পাশাপাশি অনলাইনে ই- মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।
৫.পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরের সমন্বয় সাধন করা।
৬. হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন না করা, হর্ন বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি, চালকদের শব্দ সচেতনতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করা এবং শব্দের মাত্রা অনুযায়ী যানবাহনের ছাড়পত্র দেওয়া।
৭. শব্দের মাত্রা হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত নির্মান প্রকল্প ও শিল্প-কারখানা স্থাপনে ছাড়পত্র প্রদান না করা।
৮. উচ্চ শব্দ এলাকায় ইয়ার মাফ সহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার করা।
৯. ছাদ, বারান্দা, খোলা জায়গায় গাছ লাগানো (গাছ শব্দ শোষণ করে) এবং সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনি তৈরি করা।
১০. সন্ধ্যার পর ছাদ ও কমিউনিটি হলে গান-বাজনা না করা, ব্লেন্ডার, প্রেশার কুকার ও ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার না করা, ড্রিল ও গ্রাইন্ডিং মেশিনের ব্যবহার সীমিত করা।
বাংলাদেশ প্রাণীবিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা তার বক্তব্যে বলেন, শব্দ দূষণের ফলে জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়। একেক ধরনের প্রাণীর শ্রাব্যতা সীমা একেক রকম। ফলে মাত্রাতিরিক্ত শব্দের ফলে তার দিশেহারা হয়ে যায়। সবাইকে এক ছাদের নিচে এসে শব্দ দূষণ রোধে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর নিরাপদ শ্রবণ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাকারিয়া বলেন, শব্দ দূষণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করা প্রয়োজন। এছাড়া সরাসরি শব্দ দূষণ মনিটিরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নির্দিষ্ট এলাকায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।









