দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু। পদ্মা সেতুর পর দেশের আরেক বৃহৎ প্রকল্প এটি। প্রমত্তা যমুনার বুকে স্বপ্নের সেতুর একটির পর একটি পিলারের পাইলিং কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে মোট ৫০টি পিয়ারের মধ্যে ১০টি পিয়ারের পাইলিং কাজ শেষ হয়েছে। এতে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হচ্ছে সেতুটি। দিনরাত সমানতালে চলছে এই সেতু নির্মাণের মহাযজ্ঞ। প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান আনন্দবাজারকে জানিয়েছেন, মাত্র ১০ মাসেই কাজের অগ্রগতি ৩৪ শতাংশ।
গত বছরের ২৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ সেতুটির নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জাপান এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু রেল সেতু প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে জাইকা। ২০২৪ সালের মধ্যে এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। এ সেতুটি নির্মাণের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। এই রেল সেতুটি নির্মাণ হলে একদিকে যেমন দেশের উত্তর ও দক্ষিণে যোগাযোগ খাতে নব দিগন্তের সূচনা হবে। অন্যদিকে, বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর চাপ ও ঝুঁকি কমবে।
এ প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন আনন্দবাজারকে বলেন, বর্তমান সরকার রেলকে আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি রেলকে আরও গতিশীল করার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। বঙ্গবন্ধু রেল সেতু তারই একটি অংশ। সেতুটি নির্মাণ হলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বাড়বে, বাড়বে অর্থনীতির গতি। আমরা আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে।
যমুনা নদীর উপর দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুর নির্মাণ কাজ। বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে দিনরাত দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধায়নে এগিয়ে চলছে ৪.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ডুয়েল গেজ, ডাবল ট্র্যাকের সেতুর কাজ। সেতুটি বাস্তবায়ন হলে ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করতে পারবে।
বিগত ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ চালু হয়। তবে ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল দেখা দেওয়ায় কমিয়ে দেওয়া হয় ট্রেনের গতি। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩৮টি ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিতে পারাপার হওয়ায় সময় অপচয়ের পাশাপাশি শিডিউল বিপর্যয়ে বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি। এ সমস্যা সমাধানে সরকার যমুনা নদীর উপর আলাদা একটি রেল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে নদীর দু'প্রান্তে দুটি ভাগে দেশি, বিদেশি প্রকৌশলী আর কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে চলছে এ সেতুর নির্মাণ কাজ। বড় বড় ক্রেনের সাহায্যে সেতুর প্রথম পর্যায়ের পাইলিং এর কাজ চলছে এখন। চার দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকের এ সেতুটি নির্মিত হবে মোট ৫০টি পিয়ারের উপর। ইতোমধ্যে ১০টি পিয়ারের পাইলিং কাজ শেষ হয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য মতে, ডুয়েল গেজ ডাবল-ট্র্যাকের এ সেতুটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় রেল সেতু। এটি রাজধানীর সঙ্গে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজ ও উন্নত করবে। এ ছাড়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় কমাতেও এই সেতু সহায়তা করবে। এ রেল সেতু বাস্তাবায়িত হলে বিদেশ থেকে দেশে আসা মালবাহী ট্রেন সরাসরি চলাচল করতে পারবে। এতে আমদানি রপ্তানি খরচ কমে যাওয়াসহ বঙ্গবন্ধু সেতু ও মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে। ঝুঁকিও হ্রাস পাবে বঙ্গবন্ধু সেতুর।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে সমান্তরালভাবে গাড়ি ও ট্রেন চলাচল করে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য খুবই ধীর গতিতে চলে ট্রেন। সেতুতে ট্রেনের অনুমোদিত গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার। নতুন সেতু চালু হলে কমে আসবে ভ্রমণকাল, জ্বালানি খরচও কমবে রেল বিভাগের। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হবে, কমবে পণ্য পরিবহন খরচ, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এটা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করে সরকার।
বঙ্গবন্ধু সেতু ও রেল সেতুর পশ্চিমে গড়ে উঠছে সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন ও বিসিক শিল্প পার্ক। এখানে উত্তর জনপদের সাত লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ইতিমধ্যে এসব অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশি বিদেশি শিল্প উদ্যাক্তোরা। বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণ হলে এই শিল্পাঞ্চল থেকে রেলপথ, সড়কপথ, স্থলপথ ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোন দেশে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। একই সঙ্গে উত্তর জনপদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী পরিবহনও সহজ হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। এতে এ জনপদের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অপার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।
বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব রেলওয়ে সেতুর প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান আনন্দবাজারেকে বলেন, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ৩৮টি ট্রেন চলাচল করে। নতুন রেল সেতু নির্মাণ হলে ডাবল লাইনে দ্রুত গতিতে মালবাহীসহ ৬৮টি ট্রেন চলাচল করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সাথে ট্রেন চলাচলের আন্তঃসংযোগ সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে এ রেল সেতুর ৩৪ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা দ্রুত গতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
সিরাজগঞ্জ রেল বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক নব কুমার কর্মকার বলেন, আমাদের এই জেলাটি এক সময় রেলের শহর হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর শহরের বাহির দিয়ে রেল যোগাযোগ শুরু হয়। এতে শহরের সঙ্গে রেলের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের অনেক আন্দোলনের ফলে শহর থেকে একটি ট্রেন চালু হয় রাজধানীর সাথে। বঙ্গবন্ধু রেল সেতুটি চালু হলে সিরাজগঞ্জের সাথে বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরে নতুন করে রেলসংযোগ শুরু হবে। নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে উত্তরবঙ্গে। বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব রেলওয়ে সেতুটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসছে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আবু ইউসুফ সূর্য আনন্দবাজারকে বলেন, এ সেতুর মাধ্যমে যাত্রী সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যেরও দ্রুত প্রসার ঘটবে।
আনন্দবাজার/শহক







