আগে যেখানে আট ঘণ্টাতেও ডেলিভারি হতো না এখন তিন ঘণ্টায় হয়ে যাচ্ছে: জামাল হোসেন, স্বত্বাধিকারী, মোহিনী মিনারেল ওয়াটার
বিসিকের অনুন্নত জমিগুলো প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নত করা হয়েছে: মো. জলিস মাহমুদ, উপমহাব্যবস্থাপক, বিসিক, বরিশাল
দেশে দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনীতির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে পদ্মা সেতু। স্বপ্নের সেই সেতু উদ্বোধনের তিন মাসের মধ্যেই পাল্টে যেতে শুরু করেছে বরিশালের অর্থনীতি। উপকূল ঘেঁষা বিভাগীয় এই নগরীতে শিল্পায়নে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তারা। আর এরই অংশ হিসেবে বরিশালে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে পোশাক তৈরির কারখানা। একই সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে বোতলজাত পানি শোধনাগারও।
সূত্রমতে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বরিশাল অঞ্চলে ৭৪ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এখানকার ৩৭ একর নিচু জমি ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে ১১০টি প্লট। এরইমধ্যে প্রায় ৩০টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে শুধু বিসিকেই শিল্প সম্প্রসারণ হচ্ছে না, গোটা বিভাগীয় নগরীতেই শিল্পায়নের হাওয়া লেগেছে।
ধীরগতির যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বছরের পর বছর ধরে পিছিয়ে থাকা বরিশালের অর্থনীতিতে নতুন করে গতি এনেছে পদ্মা সেতু। সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে শিল্পকল-কারখানাসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য জমি কেনাসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর অর্থনীতির আগের মানচিত্র পাল্টে যাবে। সেই সঙ্গে কমে আসবে বেকারত্বের হার।
উদ্যোক্তারা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে গোটা বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় কোনো পোশাক কারখানা ছিল না। তবে পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি আসায় দক্ষিণাঞ্চলে পোশাক কারখানা স্থাপনে ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠছেন বড় বড় উদ্যোক্তারা। আর সেই আগ্রহের সূত্র ধরেই বরিশালে প্রথমবারের মতো পোশাক তৈরির কারাখানা স্থাপন করা হয়েছে।
মূলত, বরিশালে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া পোশাক কারখানা নেমর্যাক ডিজাইন গার্মেন্টস স্থাপিত হচ্ছে বিসিক এলাকায়। ইতোমধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে এখন যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে। প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন কারখানাটিতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় এক হাজার মানুষের। আগামী তিন মাসের মধ্যেই কারাখানাটি উৎপাদনে যাবে।
নেমর্যাক ডিজাইন গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী তৌহিদুল ইসলাম দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ। আশা করি, বাকি কাজ দ্রুত শেষ করে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারব। শুধু নেমর্যাক গার্মেন্টস নয়, বিসিক এলাকায় আরও গড়ে উঠছে শীতবস্ত্রে ব্যবহৃত কমফোর্টার কারখানা। কারখানাটি উৎপাদনে গেলে বিদেশে কমফোর্টার রপ্তানি করা হবে।
এ বিষয়ে বিএনসি হোম টেক্সটাইল লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী খায়রুল হাসান দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হয়ে গেছে। আমাদের চাইনিজ সহযোগী আছে, যারা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এছাড়া এখানে বোতলজাত পানি পরিশোধনের কারখানাও হচ্ছে। আসছে নভেম্বরের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের বাজারে ছাড়ার আগেই এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়ে রয়েছে মোহিনী মিনারেল ওয়াটার।
মোহিনী মিনারেল ওয়াটারের স্বত্বাধিকারী জামাল হোসেন বলেন, আমরা আগে যে জিনিস ৮ ঘণ্টায়ও ডেলিভারি দিতে পারতাম না, এখন সেটি পাঠাতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হয়েছে। তাই আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছি। বিভিন্ন উদ্যোক্তা বরিশাল বিসিকের প্লট নেয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন বলে জানান বিসিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খান।
এ ব্যাপারে বরিশাল বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জলিস মাহমুদ দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, বিসিকের দখলে যে সব জমি ছিল সেগুলো অনুন্নত ছিল। একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সেটি উন্নত করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছরের শেষের দিকে এ প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাবে। তখন আমরা ৯০টির মতো শিল্প প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দিতে পারব।
মূলত, ১৯৬০ সালে নগরীর কাউনিয়ায় ১৩০ একর জমি নিয়ে বিসিক শিল্প এলাকা গড়ে ওঠে। বর্তমানে ১৭৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ১১৭টি চলমান। তবে বরিশাল বিসিকই নয়, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী জেলার বিসিক শিল্পনগরীতেও নতুন নতুন শিল্প কারখানার অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যে শুধু বরিশাল থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত মহাসড়কের পাশ ধরে এবং বরিশাল, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালীসহ বিভাগের ৬ জেলার বিসিক নগরীগুলোকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে জায়গা কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন ছোট-বড় বহু উদ্যোক্তা। তারা বলছেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি ব্যবসার জন্য ভালো পরিবেশ সৃষ্টি হলে উদ্যোক্তাদের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালসহ পণ্যের প্রসার ঘটাতে কৃষি ও পরিবেশবান্ধব কল-কারখানা স্থাপনের দাবি রয়েছে কৃষক সমাজের।
কৃষি উদ্যোক্তারা বলছেন, পেয়ারার জন্য বিখ্যাত বরিশাল অঞ্চলেই হতে পারে জ্যাম- জেলির কারখানা। এতে এই খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া নদী বেষ্টিত বরিশালে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিতে জড়িত লাখ লাখ মানুষ। তাদের উৎপাদিত পণ্যই হতে উঠতে পারে এখানকার শিল্পায়নের মূল কাঁচামাল। এসব পণ্যের ওপর নির্ভর করে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে পারলে এসব পণ্যের যেমন কদর বাড়বে, তেমনি কৃষকরা ন্যায্যা দামও পাবেন।









