- শ্রম শোষণে এখনও ব্রিটিশ মানসিকতা
- একদিনের আয়ে চলে না তিনবেলা খাবার
- চা-বাগানই শ্রমিকের কাছে পৃথিবী
এত অল্প টাকা মজুরি পাই, যা দিয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিয়ে একজনেরই চলে না। চা শ্রমিক নেতা রাম ভজন আক্ষেপের সুরে এ প্রতিবেদককে কথাগুলো বলছিলেন। বিভিন্ন চা-বাগানে শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপকালে শ্রমিকরা ক্ষোভের কথা জানান।
চায়ের দেশ সিলেট। দেশের ১৫৬টি চা-বাগানের মধ্যে ১২০টির অবস্থান এ বিভাগে। তন্মধ্যে হবিগঞ্জ জেলায় রয়েছে ২৪টি চা-বাগান। এসব চা-বাগানের শ্রমিকেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চা গাছ ছেঁটে যেভাবে ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেয়া হয় না। চা শ্রমিকের জীবনও যেন চা গাছের মতোই। লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের কুড়েঘরে বন্দি। চা-বাগানের জীবনও যেনো এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। আর বাগানটাই শ্রমিকদের কাছে গোটা পৃথিবী। দিনে ৮ ঘণ্টা টানা কাজ করেও সকালে চা-পাতা ভাজা, দুপুরে শুকনা রুটি এবং রাতে মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটাচ্ছেন চা শ্রমিকরা।
টানা ৮ ঘণ্টার পরিশ্রম শেষে প্রতিদিন একজন শ্রমিক ২৩ কেজি চা পাতা সংগ্রহের পরেও মজুরি হিসেবে যা পাচ্ছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যদিও দীর্ঘ আন্দোলনের পর চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭ টাকা বাড়িয়ে ১০২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ মজুরিতে সন্তুষ্ট নন চা শ্রমিকরা। এই টাকায় শ্রমিকরা না নিজে ভালোভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারছেন, না তাদের সন্তানরা ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। আর পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপুষ্টিতে ভুগছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাগান থাকলে পর্যায়ক্রমে শ্রমিকের বেতন আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই মৌলভীবাজারের বাগানগুলো রক্ষা হলে চা শ্রমিকদের সুদিন ফিরে আসবে। যদিও শ্রমিকরা আর আশারবাণী শুনতে নারাজ।
জানা যায়, দীর্ঘ আন্দোলনের পর চা শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৬৯ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা করা হয়। আবারও আন্দোলনের পর দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭ টাকা বাড়িয়ে ১০২ টাকা করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মজুরি প্রদানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। শ্রমিকরা অধিকার আদায়ে মাঝে মধ্যে আন্দোলনে নামতেও বাধ্য হন। তবে সকল বঞ্চনা, ঝুঁকি-অনিশ্চয়তা মেনে নিয়েই বাগান আঁকড়ে জীবনকাটান শ্রমিকরা। এমনকি বাগানে কাজের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হলেও, এ বাগানেই কোন না কোনোভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন তারা। কেননা বাইরের জীবন তাদের কাছে একেবারেই অচেনা। তবে বাগান কর্তৃপক্ষ নিজেদের ভূমিকার কথা বেশ স্ব-গৌরবেই দাবি করেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী নিজেরা বাড়তি কোনো সুবিধা নিচ্ছে না দাবি করে বলেন, আগে শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে ঠকানো হলেও আমরা সেখান থেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করছি। তাছাড়া শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সরকার চা শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন। সরকার তাদের রেশন দিচ্ছেন, ভাতা দিচ্ছেন, শ্রমিকদের ঘরে ঘরে বিদ্যুত ও সোলার পৌঁছে দিচ্ছেন। এর আগে কোনো সরকার এরকম সুবিধা দেয়নি।
চা শ্রমিকদের দিনকাল :
শ্রম মন্ত্রণালয় তিন শ্রেণির চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৬৯, ৬৭ ও ৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। আগে তাদের মজুরি ছিলো যথাক্রমে ৬২, ৬০, ৫৯, ৮৫ টাকার পর ১৭ টাকা বেড়ে এখন ১০২ টাকা। সঙ্গে সপ্তাহে ৩ কেজি রেশনের চাল ও আটা। এ দিয়ে পরিবার নিয়ে তিনবেলা খাবার জোটে না শ্রমিকদের। সকালে লবণ দিয়ে এক মগ চা আর সঙ্গে দুমুঠো চাল ভাজা খেয়ে বাগানে যেতে হয়। অথচ বাগান মালিকের জমি সরকারেরই খাস জমি। সামান্য অর্থে লিজ নিয়ে বাগান করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। চা শ্রমিকদের ভাষার ব্যবহার দেখলে মনে হবে এখনও বৃটিশ শাসনামল চলছে। এই যেমন- ব্যবস্থাপককে ডাকে ‘বড় বাবু’ বলে। সহকারি ব্যবস্থাপককে ‘ছোট বাবু’ বলে ডাকে। এছাড়া ব্যবস্থাপকের বাসার কাজের লোকদের ‘বেয়ারা’ বলে ডাকা হয়। এছাড়া কেউ বেড়াতে গেলে তাদের ‘সাহেব’ বলেন চা শ্রমিকরা।
একটু পিছনের গল্প :
এ শিল্পটি স্থাপিত হয়েছিল বৃটিশ ঊপনিবেশিক সময়েই। পাহাড়ি জায়গা বেছে নেয়া হয় চা শিল্পের জন্য। শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেণির হরিজন, কোল, মুন্ডা, কৈরি, চন্ডাল, সাঁওতাল প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোকজনদের। যাদের নিজস্ব সমাজ সংস্কৃতি থাকলেও তা উক্ষেপিত। জানা যায়, বৃটিশরা চা শ্রমিকদের মাদ্রাজ, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ডের রাত্রি, ডোমকা, নাগপুর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এনেছিলেন। চা বাগান বানানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানা নেই তাদের।
চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা :
কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই চা বাগানগুলোতে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তে এখনো তারা প্রকৃতির উপর নির্ভও চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। আর তাই চা বাগানের শতশত শিশু অপুষ্টির শিকার। তবে বর্তমানে চা বাগানগুলোতে হাসপাতাল থাকলেও সেখানে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দেয়া হয়। অন্যদিকে নারী শ্রমিকরা মাতৃত্বকালীন ছুটিও ঠিকভাবে পায় না। এমনও হয়েছে কর্মস্থলেই কোন কোনো নারী নবজাতকের জন্ম দিয়েছেন।
নেই শিক্ষা ও বিনোদন ব্যবস্থা :
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সকল চা-বাগানে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। তবে সেটার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক চা বাগানে শিক্ষার আলো ছড়ানোর ব্যবস্থা নেই। আর যাও আছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার (আইএলও) বিধান অনুযায়ী শ্রমিকের ৮ ঘণ্টা শ্রমের নিয়ম থাকলেও চা শ্রমিকদের কোনো শ্রমঘণ্টা নেই। আর বিনোদনের তো প্রশ্নই আসে না। চা শ্রমিকদের বিনোদন বলতে নেশায় বুদ হয়ে থাকা। তবে এখন অনেকে বিভিন্ন খেলাধুলা করে থাকে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা) মুনির আহমেদ উল্লেখ্যিত বিষয় অনেকটা স্বীকার করে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আসলে এসব বিষয়ে তেমন একটা জোর দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটা আমাদের চিন্তার মধ্যেই আছে। আশা করছি খুব শিগগিরই এসব বিষয়ে সবাই মিলে জোরালো প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আনন্দবাজার/এম.আর









