- জলাবদ্ধতায় ধান-আলুতে ক্ষয়ক্ষতি বেশি
ঘুর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে গত দুইদিনের টানা বৃষ্টিতে সারাদেশে ধান ও রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসলের ক্ষেতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে মাঠে থাকা পাকাআমন ধানের জমি প্রায় ডুবু ডুবু অবস্থা। ক্ষেতে কেটে রাখা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি আলু, সরিষা, পেঁয়াজ ও গম ক্ষেতে পানি জমেছে।
আমাদের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ জেলায় মোট আবাদকৃত আমন ধানের প্রায় ২০ ভাগ এখনও জমিতেই পড়ে আছে। কয়েকদিন ধরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি থাকলেও সোমবার দুপুরের পর শুরু হয় ভারি বর্ষণ। যা বিকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৪৬১২ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক ধান এখনো মাঠে রয়েছে। এছাড়া সরিষা চাষ হয়েছে ৯১৭১ হেক্টর, পেঁয়াজ ৭৬১ হেক্টর, গম ৪৩৫৪ হেক্টর এবং ভুট্টা ১০৮৮৫ হেক্টর।
সরেজমিনে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের বিভিন্ন মাঠে দেখা যায়, আমন ধান ক্ষেতেই পড়ে ভিজছে। কোথাও ছড়ানো, আবার কোথাও আঁটিবাধা। গত দুই দিনের লাগাতর বৃষ্টিতে মাঠের সব ধান এখন পানির নিচে। কৃষক দলিল জানান, চাষকৃত তিন বিঘা জমির মধ্যে ১০ কাঠা জমির ধান মাঠে রয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ধান ঝরে চারা গজিয়ে যাচ্ছে। একই ভাবে পানিতে সরিষা ক্ষেতও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে চরম লোকসান হবে বলে জানান তিনি ।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ জমির ধান কৃষকেরা ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি ধানের ১০ ভাগের মত বাড়িতে এনে পালা দিয়ে রাখছেন। বাকিগুলো ক্ষেতে পড়ে ভিজছে। একাধিক কৃষক জানান, চলতি আমন মৌসুমে ধানে কোন ধরনের কীটপতঙ্গের আক্রমন ছিল না। ইতোমধ্যে যে ধানগুলো মাড়াই করা হয়েছে ফলনও ভালো হয়েছে। ধানের ভালো ফলন কৃষকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। তবে পরপর দু‘দফায় নিম্নচাপের বৃষ্টিতে কৃষকের আমন ধানে অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে। একই চিত্র হরিণাকুন্ডু উপজেলায়। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ধান ক্ষেত থেকে পানি নামছে না। পাশাপাশি উপজেলার ১৩৫টি গ্রামে, সরিষা, গম সবজিসহ আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষতির বিষয়ে ফলসী, শিতলী, ভালকী, জোড়াপুকুরিয়া, বৈঠাপাড়া, কুলবাড়িয়া, কেষ্টপুর, দখলপুর গ্রামের কয়েকজন কৃষক বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমন ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে এসব বিস্তৃত এলাকার পানি নিষ্কাশনের অভাবে এখনো ধানের ক্ষেতগুলোতে হাঁটু সমান পানি জমে থাকায় কাটা ধান ঘরে তোলা যাচ্ছে না। সময় মতো পানি চলে না যাওয়ায় এসব জমিতে মনে হয় সরিষার আবাদও করা যাবে না। এমনকি আগামী বোরো মৌসুমে ইরি-বোরো ধানের চারা উৎপাদনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় আমরা কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। জেলার শৈলকুপায় তিনদিনের টানাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে ক্ষেত। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপজেলার কয়েক হাজার চাষি। ফসল রক্ষায় অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেও বৃষ্টিতে মিলছে না শ্রমিক। খেতেই পঁচে যাচ্ছে ধান। খেতে বৃষ্টির পানিতে ভাসছে কাটাধান। অনেক খেতে ধান পঁচে গেছে। অন্তত বিচালি (খড়) যাতে পাওয়া যায় সে চেষ্টায় ব্যস্ত কৃষকরা।
কৃত্তিনগর গ্রামের কৃষক মতলেব মল্লিক বলেন, সাধারণত এক বিঘা জমিতে ১৮ মণ হারে ফলন হয়। সেখানে বৃষ্টির কারণে পানিতে ডুবে যাওয়ায় আট থেকে ১০ মণের মতো ধান ঝরে যাবে। বিচালিও পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজগর আলী জানান, ধান, গম, পেঁয়াজ, সরিষা ক্ষেতে পানি জমে আছে। তবে এ পানি যদি চার থেকে ৫ দিন থাকে তবে লোকসানের পরিমানটা অনেক বেশী হবে। আমরা চেষ্টা করছি কি পরিমান জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নিরুপন করার। ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ শেষে ক্ষতিপুরণের বিষয়ে অধিদপ্তরকে জানানো হবে।
এদিকে আমাদের চাঁদপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন অসময়ের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চাঁদপুরের অধিকাংশ ফসলি জমি। এতে মাঠে থাকা কৃষকের বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে আলু চাষিদের ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর ও দক্ষিণ, হাজীগঞ্জ, কচুয়া এবং চাঁদপুর সদরের বিস্তির্ণ জমিতে আলুর চাষ হয়ে থাকে। ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণে জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন আলু চাষিরা। সবেমাত্র আলুবীজ রোপণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের ফলে নিন্মচাপের টানা বৃষ্টিতে আলুবীজ বৃষ্টির পানিতে ডুবে এখন পচনের মুখে। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার কৃষকরা মাত্র আলু চাষ শুরু করেছিলেন। তবে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের ফলে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে হঠাৎ টানাবৃষ্টিতে মতলব দক্ষিণে আলু চাষে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা।
নওগাঁও গ্রামের কৃষক জহির শেখ বলেন, সবেমাত্র এক একর জমিতে আলুবীজ রোপণ করেছি। আরো পাঁচ একর জমিতে আলুবীজ রোপন করব। এরই মাঝে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আলুবীজ বৃষ্টির পানিতে ডুবে এখন পঁচনের মুখে।
আজাদ রহমান নামে আরো এক কৃষক জানান, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মাঠের ফসলি জমি এখন পানির নিচে। এরমধ্যে যেসব ফসল এখনই ঘরে তোলার সময় হয়েছে সেইসব ফসলও ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে কৃষকদের।
চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের মোক্তার হোসেন বলেন, চলতি বছর অনেক আশা নিয়া আলু ক্ষেতি করলাম। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আলু একদম শেষ। এ ক্ষতি কেমনে পুষিয়ে উঠবো তা ভাবতে পারছি না।
বৃষ্টির কারণে শুধু আলু নয়, শীতকালীন সব ধরনের শাকসবজিরই ক্ষতি হবে। এতে শাকসবজির দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনাকাঙ্খিত ক্ষতি পুষিয়ে উঠার জন্য চাঁদপুরের কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন কৃষকরা।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জালাল উদ্দিন জানান, আমরা কৃষকদের সরকারীভাবে সার ও বীজ প্রদান করেছি। তবে অসময়ের বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আনন্দবাজার/এম.আর









