আদিত্য চোপড়া পরিচালিত ও শাহরুখ খান ও কাজল অভিনীত ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবিটিকে শ্রেষ্ঠপ্রেমের ছবি বলেই আমরা জানি-মানি। তবে সেখানে নীরবে আরো দুটি বিষয় রয়েছে। ছবিটিতে ইংল্যান্ড ও ভারতের রেলব্যবস্থাপনার দুটি চিত্রও আছে। শাহরুখ খান ও কাজলের (রাজ মালহোত্রা-সিমরান) পরিচয় পর্বটি হয় ইংল্যান্ডের মেট্রোরেলে। দু’জন দুদিক দিয়ে দৌড়ে অবশেষে একটি বগিতেই উঠেন। আবার শেষ দৃশ্যে ভারতীয় রেলকে দেখানো হয়, যে রেল দিয়ে সিমরানকে নিয়ে নিজ ঘরে ফেরেন রাজ মালহোত্রা। এ দৃশ্যগুলো নিশ্চয়ই এমনিতেই রাখা হয়নি। বরং ভারতীয় রেলপথ সেবাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতেই এমন দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে মনে করা হয়।
আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও রেলকে দেখানো হয়। তবে বেশিরভাগই নেতিবাচক হিসেবে। যেমন অনেক নায়কের ছেলেবেলা কাটে রেললাইনের বস্তিতে। ময়লা ও নোংরা পরিবেশ। ধীরে ধীরে সে জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। অথচ বস্তি ও রেলকে ইতিবাচক হিসেবেও তুলে ধরা যায়। কিন্তু তা খুব কমই দেখানো হয়। এসব দেখে রেলে যাতায়াত করতে আপনি উদ্বুদ্ধ হওয়ার চেয়ে এড়িয়ে যেতেই বেশি পছন্দ করবেন। প্রথমেই নেতিবাচক দেখে আমরা রেলের প্রতি অনিহা প্রকাশ করি।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে রেলে ভ্রমণ করেছেন একটি বেসরকারি মাল্টিন্যাশনাল পিআর এজেন্সির সিনিয়র একাউন্ট এক্সিকিউটিভ প্রিয়াংকা ঘোষ। তিনি বলেন, ভারতের স্থানীয় লোকজন রেলের প্রতি খুবই আগ্রহী ও নির্ভরশীল। সেখানকার যাত্রীরা রেলসেবাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে এমনকি ঝুলেও যায়। যেমনটা আমাদের দেশের বাসসেবায় দেখা যায়।
প্রিয়াংকা ঘোষ আলিপুর থেকে ধমধম পর্যন্ত রেল ভ্রমণ করেছেন। উঠেছেন ভারতীয় মেট্রোরেলেও। তিনি বলেন, সেখানে যা দেখেছি তা হলো লোকজন এক জেলা থেকে অন্য জেলাতে যেতেও রেলের সেবাকে প্রাধান্য দেয়। তা ছাড়া সেখানে সংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী রেল আছে পর্যাপ্ত ফলে সিডিউল বিপর্যয় নাই বললেই চলে। অপরদিকে আমাদের দেশে এটি নিত্যসঙ্গী। তা ছাড়া ভারতে টিকিটিং পদ্ধতিও সহজ।
প্রিয়াংকা ঘোষ বলেন, আমার মনে হয় আমাদের দেশে টিকিটিং ব্যবস্থাটি আরো সহজ করা দরকার। মানুষ চাইলেও টিকিট পায় না। আমি নিজেও কয়েকবার বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণ করেছি তাতে দেখিছি সাধারণ মানুষ কতটা বিপদে ও সমস্যায় পড়ে।
বাংলাদেশের রেলসেবাকে আরো যুগোপযুগী করতে তরুণ চিন্তক শাকিরুল হক বলেন, আমাদের সিডিউল বিপর্যয় কমাতে রেলের সংখ্যা বাড়াতে হবে। টিকিটিং ব্যবস্থা ডিজিটাল তথা যতটা সম্ভব ই-টিকিটিং ব্যবস্থায় যেতে হবে।
অবশ্য প্রতিবেদক নিজেই গত আগস্টে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও তার কয়েক মাস আগে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার কমলাপুর পর্যন্ত ভ্রমণ করেছেন। দুটি পথেই দেখা যায়, আসনের চেয়ে যাত্রীর সংখ্যা দেড় গুণ।
যেমন- ঢাকা থেকে ভৈরবগামী এগারসিন্ধু এক্সপ্রেসে দেখা যায়, একটি বগিতে ৪৮টি আসনের বিপরীতে যাত্রী উঠেছে ১৫০ জন। আবার ফেরার পথে উপকূল এক্সপ্রেসে দেখা যায়, একশ আসনের বিপরীতে লোক উঠেছে আরো ৫০ জন বেশি। সেখানে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাত্রীরা পড়ছে বিপাকে। কেননা দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কোথায় ধরতে হয় সেক্ষেত্রে নেই কোনো হ্যাংগার। তা ছাড়া একজন আরেকজনের শরীরের ওপর এসে পড়ছে।
এ পথে নাজমা আক্তার নামের সরকারি এক চাকরিজীবীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহেই তাকে বাড়িতে আসতে হয়। এক্ষেত্রে যথা সময়ে টিকিট পান না। তিনি স্থানীয় দালালদের থেকে একশ টাকার টিকিট দুইশ টাকা করে কিনেন। বেশিরভাগ সময়ই এই কাজ করতে হয়। নাজমার পরামর্শ হচ্ছে আরো অধিক রেলের প্রয়োজন। সম্ভব হলে রেলপথ ডবল করা দরকার। এতে করে বাসের ওপর চাপ কমবে। মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারবে। তাতে রাষ্ট্রেরও লাভ হবে। রেলে লোকসান কমে যাবে।
ময়মনসিংহ হতে ঢাকায় আসার পথে প্রতিবেদকের চোখে পড়ে, একটি আসনের বিপরীতে তিন থেকে চারজন অতিরিক্ত যাত্রী উঠেছে। এতে দাঁড়িয়ে থাকায় কঠিন অবস্থায় পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। এক্ষেত্রে বাসের মতো ছাদের সঙ্গে হ্যাংগার ঝুলিয়ে রাখলে যাত্রীদের কষ্ট অনেকটা লাগব হয়।
ভারতবর্ষে রেলপথ চালু হয় ব্রিটিশ শোষণামলে ১৮৫৩ সালে। বাংলায় রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে। প্রথমদিকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কাজের জন্য রেলপথ চালু করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত বিভক্তির পর বেঙ্গল-আসাম রেলওয়ে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান উত্তরাধিকার সূত্রে পায় ২,৬০৬.৫৯ কিলোমিটার রেললাইন এবং তা ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর) নামে পরিচিত হয়। ইবিআর পায় ৫০০ কিলোমিটার ব্রডগেজ এবং ২,১০০ কিলোমিটার মিটারগেজ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অংশে পড়ে ২ হাজার ৯৫৫.৫৩ কিলোমিটার। বাংলাদেশ রেলওয়েকে মূলত দুইটি অংশে ভাগ করা হয়, একটি অংশ যমুনা নদীর পূর্ব পাশে তথা পূর্বাঞ্চল এবং অপরটি পশ্চিম পাশে তথা পশ্চিমাঞ্চল নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। পূর্ব পাশের অংশের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৭৯ কিলোমিটার এবং পশ্চিম পাশের অংশের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের রূপসা নদীর পূর্ব প্রান্তের ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রূপসা-বাগেরহাট ব্রড-গেজ রেলপথ সেকশনটিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের তৃতীয় অংশ হিসেবেও ধরা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে দুই ধরনের রেলপথ চালু আছে: ব্রড-গেজ (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি বা ১ হাজার ৬৭৬ মিলিমিটার) এবং মিটার-গেজ (১০০০ মিলিমিটার)। দেশের পূর্বাঞ্চলে মিটার ও ব্রড-গেজ উভয় ধরনের রেলপথ বিদ্যমান, অবশ্য পূর্বাঞ্চলে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব রেলওয়ে স্টেশন হতে ঢাকা পর্যন্ত ব্রড-গেজ রেলপথও রয়েছে। পূর্বে ন্যারো-গেজ (২ ফুট ৬ ইঞ্চি বা ৭৪৬ মিলিমিটার) রেলপথ চালু থাকলেও এখন আর তা ব্যবহার হয় না।
বাংলাদেশ আমল: বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এদেশের রেলওয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে, যা উত্তরাধিকার সূত্রে পায় ২ হাজার ৮৫৮.৭৩ কিলোমিটার রেলপথ ও ৪৬৬টি স্টেশন। ৩ জুন ১৯৮২ সাল, রেলওয়ে বোর্ড বিলুপ্ত হয়ে এর কার্যক্রম যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের রেলওয়ে বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয় এবং বিভাগের সচিব ডিরেক্টর জেনারেল পদপ্রাপ্ত হন।
১২ আগস্ট ১৯৯৫ সাল, বাংলাদেশ রেলওয়ের নীতিগত পরামর্শ দানের জন্য ৯ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটি (বিআরএ) গঠন করা হয় এবং এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু সেতু উন্মুক্তকরণের ফলে জামতৈল থেকে ইব্রাহিমাবাদ ব্রডগেজ রেলপথের মাধ্যমে পূর্ব-পশ্চিম রেল যোগাযোগ শুরু হয় ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন থেকে। সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর ফলে ঢাকা এবং কলকাতার মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮২ সালের ২ জুন পর্যন্ত রেলপথের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ন্যস্ত ছিল একটি রেলওয়ে বোর্ডের নিকট, যাতে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য থাকতো। ১৯৮২ সালের ৩ জুন প্রশাসনিক ও কার্যপরিচালনার সুবিধার্থে রেলওয়ে বোর্ডকে বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের রেলওয়ে বিভাগের (ডিভিশন) নিকট ন্যস্ত হয়। এক্ষেত্রে উক্ত বিভাগের সচিব বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করতেন। একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ রেলওয়েকে দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়, যথা পূর্ব ও পশ্চিম। বিভাগ দুটি দুজন মহাব্যবস্থাপকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকত যারা বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে দায়বদ্ধ হন।
১৯৯৫ সালের ১২ আগস্ট রেলপথের দৈনন্দিন কার্যক্রম মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক হয়ে রেলওয়ে প্রফেশনালদের নিয়ে মহাপরিচালকের ওপর ন্যস্ত হয়। একই বছর নীতিগত পরামর্শ দানের জন্য ৯ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটি (বিআরএ) গঠন করা হয়, এবং এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তবে এর কার্যক্রম পরবর্তীতে অব্যাহত থাকেনি।
১৯৯৬-২০০৩ সালের সময়কালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও রেলপথ বিভাগ হতে বাংলাদেশ রেলওয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ২০১১ সালের ২৮শে এপ্রিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতায় রেলপথ বিভাগ নামে নতুন বিভাগ গঠিত হয়।
২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে ভেঙে নতুন রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। মন্ত্রণালয়টির প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এরপর ২০১২ সালে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মুজিবুল হক মুজিব। ২০১৯ সালে নতুন দায়িত্ব পান নূরুল ইসলাম সুজন। বাংলাদেশ সরকারের অধীনে ২টি রেল বিভাগ রয়েছে: পশ্চিমাঞ্চল (১. রংপুর বিভাগ, ২. রাজশাহী বিভাগ, ৩. খুলনা বিভাগ, ৪. ফরিদপুর বিভাগ)। পূর্বাঞ্চল (১. সিলেট বিভাগ, ২. চট্টগ্রাম বিভাগ, ৩. ঢাকা বিভাগ, ৪. ময়মনসিংহ বিভাগ)।
আনন্দবাজার/শহক









