- বিশ্বে বেড়েছে ৪০ শতাংশ, বাংলাদেশে ১৩
দেশের ৭৯ ভাগ বিনিয়োগ বেসরকারিখাতে। তাদের সহায়তা দিলে দেশ এগিয়ে যাবে
সিরাজুল ইসলাম, নির্বাহী চেয়ারম্যান, বিডা
করোনা মহামারির সংকট কাটিয়ে বছরওয়ারি বিনিয়োগে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন (২৮৯ কোটি ৬০ লাখ) ডলার বা ১৩ শতাংশ বেড়েছে বলে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে উচ্ছ্বসিত নয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ভারত যেখানে এক বছরে ৮৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে সেখানে বাংলাদেশে সামান্য বিনিয়োগে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) এসেছে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার। শুধু বিদেশি বিনিয়োগ নয়, প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়নেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতে একবছরে আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। বিডা ও বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নিজস্ব কার্যালয়ে স্মারক অনুষ্ঠানে নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। বাৎসরিক ১৩ শতাংশ হারে বিনিয়োগ বেড়েছে। অথচ বিশ্বে বেড়েছে ৪০ শতাংশ। ভারতে ২০১৮-১৯ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলার, ২০১৯-২০ সালে ৪০ বিলিয়ন ডলার ও চলতি অর্থবছরে ধরা ছোঁয়ার বাইরে ৮৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে এসেছে। আর আমরা সামান্য ১৩ শতাংশ বৃদ্ধিতেই আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছি।
তিনি জানান, চীন স্বাস্থ্যের একটি বিশেষখাতে বিনিয়োগ করতে চায়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, চীন যেভাবে বিনিয়োগে কাজ করছে তা নিয়ে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ আছে। কেননা দেশটি যত বড় সে অনুযায়ী আমাদের এখানে তাদের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ৫ নম্বরে। অথচ তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশ। সেখান থেকে আরও বিনিয়োগ আনা প্রয়োজন।
সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, অনেক বিদেশি বাংলাদেশের নাম শোনেনি। জানেও না। বিশ্বের প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে দেশকে পরিচিত করে তোলাই আমাদের কাজ। ইতিপূর্বে যারা এ দেশ দেখে গেছে বা বিদেশে অবস্থান করছেন তারা দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে জানে না। গত তিনবছরে সরকারি নীতিতে কিছু পরিবর্তন এনেছি। বিশেষ করে করপোরেট কর কমাতে পেরেছি। এতে ৩৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগামীতে ২০ শতাংশে আসবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, একটি খাত তথা রেডিমেড গার্মেন্ট-আরএমজি সেক্টরকে সব সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়েছে। একটি খাতে এক ও অন্যান্য খাতে ৯৯ শতাংশ রপ্তানি হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সমান নীতি সহায়তা দরকার। কেননা হাত বেঁধে দিয়ে নির্দেশ দিলেই দৌড়ানো যায় না। বাজেটের পলিসিগুলো ইতিবাচক বলেও মনে হয়। তিনি আরও বলেন, দেশের ৭৯ শতাংশ বিনিয়োগ বেসরকারিখাতে। তাদের সহায়তা দিলে দেশ এগিয়ে যাবে। বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে চীন ও হংকং ৭৭০ বিলিয়ন ডলার এবং কোরিয়া ১৬১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। ভারতে ৮৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে চলতি অর্থবছরে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বিদেশি বিনিয়োগের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, আমরা প্রধানত ৪টি বিষয়কে প্রাধান্য দেই। তারমধ্যে ১. অর্থ আসবে, ২. টেকনোলজি আসবে, ৩. স্কিলস যুক্ত হবে, ৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিদেশিরা এসে বছরের পর বছর আমাদের দেশে কাজ করলে দেশের জনগণ কোথায় যাবে প্রশ্ন রাখেন তিনি। বলেন, সেজন্য তাদের ৫ বছরের বেশি কাজ করার সুযোগ দেয়া হবে না। ১৫০ মিলিয়নের বিনিয়োগ হাত ছাড়া যাতে না হয় সেজন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কিছু লোককে কয়েক বছর সুযোগ দেয়া হয়েছে।
অর্থপাচার রোধে বিনিয়োগ সহজ করা যায় কিনা এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিনিয়োগ করার পদ্ধতি সহজ করতে হবে। আমাদের প্রক্রিয়াগুলো বিনিয়োগবান্ধব হতে হবে। সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে সরকারকেই। বিডা অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। আমাদের পক্ষ থেকে যা করার দরকার সব সহযোগিতা করা হবে। বিসিসিসিআই’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা বলেন, বিডার সঙ্গে চুক্তির কার্যকারিতা দরকার। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কূটনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চীন বহুকাল থেকেই আমাদের বিনিয়োগ সহযোগী। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি থাকলে কাজ করতে সহজ হয়।
আল মামুন মৃধা বলেন, আজ আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য একটটি আনন্দঘন দিন। আজ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা একে অপরের বিনিয়োগ বিকাশের অংশীদার হয়েছি। যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি খাতে আরো বেশি চীনা বিনিয়োগ সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশ দিন দিন চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে আর লক্ষ্যে বিসিসিসিআই এর ৭০০ এর বেশি সদস্য কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিডার পরিচালক মো. শাহ্ আলমের উপস্থাপনায় স্বাগত বক্তব্য দেন নির্বাহী সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী। বিসিসিসিআই সভাপতি গাজী গোলাম মরতুজা, সিনিয়র সহ-সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. সুলতান উদ্দিন ইকবালসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, আঙ্কটাডের সর্বশেষ ‘বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২২’ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে এফডিআই আগের বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এ বছর দেশে সরাসরি বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন (২৮৯ কোটি ৬০ লাখ) ডলার। এর আগে পরপর দুই বছর এফডিআই অনেক বেশি হারে কমে ২০২০ সালে ছিল ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে এবং ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমেছিল।
আনন্দবাজার/শহক









