অস্থিরতার মধ্য দিয়েই পুরো বছর পার করেছে বাংলাদেশের টেলিকম সেক্টর। পাওনা আদায় নিয়ে শীর্ষ দুই অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবির সাথে সরকারের নিয়ন্ত্রকসংস্থা বিটিআরসির ঝামেলা শুরু হওয়া এ সঙ্কট বছর শেষেও সমাধান হয়নি। এতে গ্রাহকসেবার মান খুবই নিম্নমুখী হয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে অপারেটর দু’টি।
বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালেও যেন শেষ হচ্ছে না। বছরের শেষ দিকে এসে গ্রামীণফোনের আন্তর্জাতিক মালিকানা প্রতিষ্ঠান টেলিনর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে উকিল নোটিশ পাঠালে আলোচনা তৈরি করে।
বিটিআরসির দাবি, গ্রামীণফোনের কাছে নিরীক্ষা আপত্তি দাবির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা পাবে বিটিআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। বকেয়া আদায়ে গত ২ এপ্রিল অপারেটর দু’টিকে চিঠি দেয় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিটিআরসি।
তাগাদা দেয়ার পরও ওই টাকা পরিশোধ না করায় গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ব্যান্ডউইথ ক্যাপাসিটি ৩০ শতাংশ এবং রবির ১৫ শতাংশ সীমিত করতে আইআইজিগুলোকে নির্দেশ দেয় সংস্থাটি। কিন্তু তাতে গ্রাহকের সমস্যা হওয়ায় ১৩ দিনের মাথায় ওই নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেয় তারা।
এরপর ২২ জুলাই গ্রামীণফোন ও রবিকে বিভিন্ন প্রকার সেবার অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেয়া স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। দফায় দফায় চেষ্টা করেও নিরীক্ষা আপত্তির টাকা আদায় করতে না পেরে গ্রামীণফোন ও রবির লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে দুই অপারেটরকে নোটিশ পাঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নোটিশের জবাব না দিলে বা পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই দুই অপারেটরে প্রশাসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও জানান দেয় বিটিআরসি।
অন্যদিকে শুরু থেকেই অডিট আপত্তিকে ‘একতরফা ও বিতর্কিত’ হিসেবে উল্লেখ করে আলোচনা বা সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে সামাধান চেয়ে আসছে এই অপারেটররা। সালিসি বৈঠক চেয়ে একাধিকবার বিটিআরসিতে চিঠি পাঠানো হলেও তাতে সাড়া দেয়নি সংস্থাটি। দুই পক্ষের বিরোধের একপর্যায়ে গ্রামীণফোন ও রবির এনওসিও বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। পরে সরকারের হস্তক্ষেপে কিছুটা নমনীয় হয় বিটিআরসি।
বকেয়া আদায়ে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক, এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও অপারেটর দু’টির শীর্ষ নির্বাহীদের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়।
বৈঠকের পর দুই/তিন সপ্তাহের মধ্যে বকেয়া পাওনা আদায়ের বিষয় সমাধান হবে বলেও ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তবে ওই ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান আসেনি।
গ্রামীণফোনের আবেদনের কারণে একপর্যায়ে পাওনা আদায় দুই মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে আদালতের এমন সিদ্ধান্তের পরেও দুই অপারেটরে প্রশাসক নিয়োগের অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। অবশেষে গত ২৪ নভেম্বর বিটিআরসিকে দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হবে বলে গ্রামীণফোনকে নির্দেশ প্রদান করেন আপিল বিভাগ।
আগামী তিন মাসের মধ্যে এ পরিমাণ টাকা দিতে না পারলে বিটিআরসি অপারেটরটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে বলেও রায়ে বলা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে গ্রামীণফোনের মালিকানা প্রতিষ্ঠান টেলিনর সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছে বলে সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গণমাধ্যমকে জানান। এতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। জনগণের পাওনা আদায়ে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানান মন্ত্রী। টেলিনর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ সুরক্ষা করতেই তাদের এমন পদক্ষেপ।
এ দিকে এনওসি বন্ধ থাকায় বছরের বেশির ভাগ সময় ধরেই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বা বিটিএস স্থাপন করতে পারেনি অপারেটররা। যন্ত্রাংশ আমদানির অনুমতি, নতুন কোনো প্যাকেজ চালু এবং চলতি প্যাকেজে কোনো পরিবর্তনও আনতে পারেনি এই দুই অপারেটর। এতে এক দিকে যেমন গ্রাহক সেবা তলানিতে নেমেছে, তেমনি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে অপারেটর দুটির।
একাধিক মোবাইল গ্রাহক অভিযোগ করেন, গত কয়েক মাস ধরে নির্ধারিত টাকা দিয়ে প্যাকেজ বা কলরেট ক্রয় করেও কাঙ্খিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। কলড্রপের পরিমাণ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। একটি নাম্বারে কয়েকবার ডায়াল করার পর সংযোগ পেলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার কেটে যাচ্ছে। ইন্টারনেটের গতিও অনেক কমে গেছে। কাস্টমার সার্ভিসে কল করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।









