নওগাঁয় চলতি বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ২ হাজার মেট্রিক টন ধান কম উৎপাদন হয়েছে। বিঘাপ্রতি ধানের গড় ফলন কম হয়েছে ৫ থেকে ৭ মণ
ধান চালের রাজধানী হিসেবে পরিচিত নওগাঁয় এবার বোরো চাষে ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, চলতি বোরো মৌসুমে এ জেলায় এবার বৈরি আবহাওয়া, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ আর শ্রমিক সংকটের কারণে বিঘা প্রতি ধানের ফলন গড়ে কমে গেছে প্রায় ৫ থেকে ৭ মণ। তবে জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, গড়ে বিঘা প্রতি ২ মণের কাছাকাছি ফলন বিপর্যয় ঘটেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এবার বোরো মৌসুমে মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়ছে। ধান উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১২ লাখ মেক্টিক টন।
বোরো মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া ছিল কৃষকের পক্ষে। তবে শুরু থেকেই কৃষকদের পড়তে হয় কয়েক দফা ক্ষতির মুখে। বোরো চাষের শুরুতেই হাল চাষ আর পানি সেচে ব্যবহৃত ডিজেল তেলের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় প্রথম দফায় গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। এরপর ফসলে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ আর সার কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধিতে গুনতে হয় দ্বিতীয় দফা। তৃতীয় দফায় বৈরি আবহাওয়ার কারণে কারণে দফায় দফায় ঝড় বৃষ্টির কবলে পড়ে বোরো ক্ষেত। এতে আধাপাকা বোরো ধান গাছ খেতেই নুয়ে পড়ে। এরপর দেখা দেয় শ্রমিক সংকট। শ্রমিক সংকটের কারণে সময় মত পাকা ধান ঘরে তুলতে না পারায় দেখা দেয় বিপর্যয়।
মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি এবার ১১ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। বৈরি আবহাওয়ার কারণে তার প্রায় সব জমির ধান গাছ মাটিতে নুয়ে পড়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় অনেক ক্ষেতে ধান গাছে পচন দেখা দিয়েছে। আবার দীর্ঘ সময় ধান পানির সংস্পর্শে থাকায় ধানের সোনালি রং নষ্ট হয়ে গেছে। নুয়ে পড়া ধান চিটা ধরে নষ্ট হচ্ছে। এতে ফলন কমে গেছে। যেখানে প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ ধান উৎপাদন হয় সেখানে এবার সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২২ মণ হারে ধান উৎপাদন হচ্ছে। এরপর শ্রমিক সংকটে নুয়ে পড়া ধান ঘরে তুলতে শ্রমিক ব্যয় বেড়ে ধানের ফলনে “বোঝার উপর শাকের আঁটি” হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধানের সোনালি রং নষ্ট হওয়ায় বাজারে এ ধান বিক্রি করতে গেলেও ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তাও কেউ কিনতেই চায় না। এছাড়াও একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধান চাষ করে কৃষকদের কয়েক বছর ধরে লস এর মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক কৃষক। সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার মাধ্যমে সহযোগিতার দাবিও জানান সাধারণ কৃষকরা।
একাধিক কৃষকের তথ্য মতে, এ জেলায় এবার মোট লক্ষ্যমাত্রার ৭ শতাংশ ফলন বিপর্যয় ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় ৭ মণ ধান কম উৎপাদন হয়েছে। তথ্য অনুসারে হিসেব করলে দেখা যায়, এ জেলায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন ধান কম উৎপাদন হয়েছে।
অপরদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরর তথ্য মতে প্রতি বিঘায় ২ মণ হারে ফলন বিপর্যয় ঘটেছে। অর্থাৎ মোট লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ২ হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদন কম হয়েছে।
নওগাঁ জেলায় আনুমানিক কত হেক্টর জমির ধান নুয়ে পড়েছে তা জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ১১.৮৪ হেক্টর জমির ধান বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়াও কোথাও কোথাও কয়েক দফা ঝড় বৃষ্টির কারণে বিঘা প্রতি ২-১ মণ ধান কম উৎপাদন হয়েছে। কৃষকদের নুয়ে পড়া ধানের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রতিনিয়তয় নানান পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।









