পানির অপর নাম জীবন। দুর্গম এলাকার পাহাড়ি বাসিন্দারা সেই জীবন রক্ষা করছে যুদ্ধ করে। রোদের তাপ বাড়ছে প্রতিবছর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে পাহাড়ের পানি উৎসে। প্রাকৃতিক উৎসগুলো দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর প্রতিবছর নিচে নেমে যাওয়ায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানসহ দৈনদিন কাজে ব্যবহারের জন্য পানি মিলছে না। শুকিয়ে যাওয়া ছড়া ঘেঁষে কুয়া তৈরি করে পানি সংগ্রহ করলেও সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে না পানি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফোঁটা ফোঁটা ধারায় কুয়াতে পানি উঠছে।
গ্রীষ্মকাল আসার আগেই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ের নিচে নেমে মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। একজন পানি সংগ্রহ করলে কুয়াতে আর পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অন্য পানি সংগ্রহকারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এক একজনকে পানি সংগ্রহ করতে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি সময় খরচ করতে হচ্ছে।
প্রতিবছর গ্রীষ্মে পাহাড়ে পানি সংকট তীব্রতর হয়। এবার ফাল্গুন মাস থেকেই পানি সংকট দেখা দিয়েছে। চৈত্র- বৈশাখ মাসে কেমন পরিস্থিতি দাঁড়াবে তা নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছে। পানির জন্য হাহাকার বাড়বে বলে মনে করছেন পাহাড়ি বাসিন্দারা।
দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম সীমানাপাড়া এলাকাবাসী জানান, তাদের মূলত ছড়া ও কুয়ার পানির ওপরই নির্ভর করতে হয়। অথচ এখনই ছড়া শুকিয়ে গেছে। ছড়া ঘেঁষে যেসব কুয়া তৈরি করে পানি সংগ্রহ করা হয়, সেসব কুয়াতেও এখন আর পানি উঠছে না। নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থাও নেই। আগামী গ্রীষ্মে তাদের কি পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তা নিয়ে আঁতকে উঠছেন অনেকে।
তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রিপন চাকমা দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আগে ঘন বন ছিল, গাছপালা ছিল। এখন উজার হয়ে গেছে। মাটিতে রস থাকে। সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পড়লে তা শুকিয়ে যায়। এসব পরিস্থিতির প্রধান কারণ বন উজার। পাহাড়ে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন বাগান গড়ে উঠছে। বাগানে আগাছা নাশক স্প্রে করে। বাগান পরিষ্কার হয়। জীব-বৈচিত্র্য তাতে নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ মরে যায়। মাটি বেশ কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত পুড়ে যায়।
রিপন চাকমা আরো বলেন, অপরিকল্পিতভাবে টিউবওয়েল ও ডিপটিউবওয়েল বসানো হচ্ছে। যাতে অনবরতভাবে পানি পড়ছে। এইগুলো হওয়ার কারণে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এগুলোতে আগের মতো আর পানি পড়ছে না। আগের চেয়ে কম পড়ছে। পানিস্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানি সংকট বেড়ে যাচ্ছে। যে কারণে চাষবাষও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় সংকট হবে পানি। সেই সংকট মনে হয় এখনি শুরু হয়ে গেছে। পানি না থাকলে পাহাড়ি এলাকা বিরানভূমি হয়ে পড়বে।
দীঘিনালা উপজেলা থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে সরেজমিনে সীমানাপাড়া, মিলনকার্বারীপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছড়া শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে যাওয়া ছড়া ঘেঁষে কুয়া তৈরি করে পানি সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কুয়াতে পানি উঠছে না। এক কলস পানি ভর্তি করতে ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। সংকটের কারণে পানি সংগ্রহে যুদ্ধ করতে হয়। পানি সংগ্রহ করতেই দিনের অর্ধেক চলে যায়। মূলত দুর্গম এলাকাগুলোতে নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই।
দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম সীমানাপাড়া, মিলন কাব্বারীপাড়া, মাইটিপাড়া, তৈইদুছড়া, ঝরনাপাড়া হাপিংপাড়াসহ দুর্গম পাড়াগুলোতে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। মিলন কার্বারীপাড়ার বাসিন্দা শশাঙ্কা ত্রিপুরা দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, এক কলস পানি সংগ্রহ করতেই ব্যয় হয় ঘণ্টা দেড়েক সময়। আর সেই পানি যে শিশুদের খাওয়া হবে তাতে তাদের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
মিলন কাব্বরীপাড়ার গ্রাম প্রধান নারী (কার্বারী) সুমনা ত্রিপুরা দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষরা জুম চাষ ও দিনমজুরি কাজ করে সংসার চালান। গ্রামের মানুষদের পক্ষে পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে কুয়া থেকে যে পানি নিয়ে আসা হয় সে পানি পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হতে হচ্ছে।
দুর্গম সীমানাপাড়ার গ্রামের পাড়া প্রধান (কার্বারী) চয়ন ত্রিপুরা দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আমাদের দুর্গম এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। চৈত্র-বৈশাখ মাস এলে পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়। ছড়া ও কুয়ার পানি পান ও প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে হয়। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে পানির ব্যবস্থা করলে আমাদের জীবন বাঁচবে।
দীঘিনালা উপজেলার ১নং মেরুং ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড মেম্বার ভুবন বিকাশ ত্রিপুরা দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, দুর্গম গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। সোলার বসিয়ে পানি তোলা যায় কিনা পরিকল্পনা করছি। তিনি বলেন, আমাদের সব গ্রামে পানির সংকট। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় থেকে দুর্গম এলাকাগুলোতে পানির ব্যবস্থা করলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো।
দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদা বেগম লাকী দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, দুর্গম এলাকায় পানির উৎস খোঁজ করা হচ্ছে। ওই সব দুর্গম এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনী, সড়ক বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস পানি দেয়। তাদের সঙ্গে আমরাও চেষ্টা করছি। পানির ব্যাপার নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন। মাহমুদা বেগম লাকী আরো বলেন, রতিচন্দ্রপাড়া, সীমানাপাড়া, মিলন কাবারীপাড়া, হাজাপাড়া, প্রশিক্ষণটিলা, হাতাছড়া, এই দুর্গম গ্রামগুলোতে দ্রুত পানির ব্যবস্থা করা হবে। জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও আশ্বস্ত করেছেন।
খাগড়াছড়ি জনস্বাস্থ্য নির্বাহী প্রকৌশলী রেবেকা আহসান দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, দুর্গম এলাকার যেখানে যেখানে পানি সংকট আছে সেসব এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে।









