- চট্টগ্রামে একের পর এক ভয়াবহ জালিয়াতি
- কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি
সম্প্রতি একটি করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দিয়ে ১০৩টি গাড়ি নিবন্ধন জালিয়াতি চক্রকে সনাক্তের পর নতুন করে আবারও এক টিআইএন সনদ দিয়ে আরও ১৯৩টি গাড়ি নিবন্ধনের প্রমাণ পেয়েছে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) রেজিস্ট্রেশন নেওয়া গাড়ির তথ্য যাচাই করে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টসূত্র জানিয়েছে, নিবন্ধনকৃত এসব গাড়ির মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির পাশাপাশি দেশের স্বনামধন্য পাঁচ থেকে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের গাড়িও রয়েছে। এদিকে জালিয়াতি করে নিবন্ধন পাওয়া গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইতোমধ্যে বিআরটিএ’র চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল। তবে নিজেদের দায় অস্বীকার করে এক টিআইএনে একাধিক গাড়ি নিবন্ধনের দায় গাড়ির নিবন্ধন নেয়া ব্যক্তির উপরেই চাপিয়ে দিচ্ছে চট্টগ্রাম বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। এসব জালিয়তির মাধ্যমে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল এসব ঘটনায় বিআরটিএর এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারি ও কিছু দালাল জড়িত রয়েছে উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, এক টিআইএন সনদে ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রেবাস, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন ধরণের ১৯৩টি গাড়ি নিবন্ধন করা হয়েছে। এ জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। পাশাপাশি টিআইএন সনদধারী মূল ব্যক্তিও রীতিমত বিপাকে পড়ছেন, হয়রানির শিকার হচ্ছেন। করঅঞ্চল ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। এরআগে তানিয়া জেসমিন নামে এক নারীর টিআইএন ব্যবহার করে ১০৩টি গাড়ি জালিয়াতির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করার প্রমাণ পায় চট্টগ্রাম করঅঞ্চল।
গত ২০ সেপ্টেম্বর জাল টিআইএনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিআরটিএর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির ফলে এনবিআর বিআরটিএ’র ডাটাবেজে রক্ষিত গাড়ির মালিকের নাম, ঠিকানা, টিআইএনসহ যাবতীয় তথ্য দেখার সুযোগ পাচ্ছে। চট্টগ্রাম কর অঞ্চল এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএতে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া গাড়ির তথ্য যাচাই করে এক টিআইএন দিয়ে একাধিক গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের প্রমাণ পেয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বিআরটিএর নির্ধারিত ফরমে গাড়ি নিবন্ধনের আবেদন করতে হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই শেষে আবেদনকারীকে রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিতে হয়। তারপর গাড়ি পরিদর্শন করিয়ে মালিকানা ও প্রয়োজনীয় তথ্য বিআরটিএ ইনফরমেশন সিস্টেমে অন্তর্ভূক্ত করতে হয়। গাড়ি নিবন্ধনের অনুমতি পাবার পর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্যাক্স টোকেন প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরসহ গ্রাহককে দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই টিআইএন সার্টিফিকেট দিতে হয়। অথচ বিআরটিএর কিছু দালালচক্র এক টিআইএন সনদে একাধিক গাড়ি নিবন্ধন পাইয়ে দেয়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন টিআইএন মূল সনদধারী।
সংশ্লিষ্ট আইনে বলা আছে, আয়কর অধ্যাদেশে জাল টিআইএন ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীর ওপর আর্থিক জরিমানাসহ কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। ১২৪এ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের টিআইএন অথবা জাল টিআইএন ব্যবহার করেন বা আয়কর আইন অনুযায়ী যেসব ক্ষেত্রে টিআইএন ব্যবহার বাধ্যতামূলক, সেসব ক্ষেত্রে জাল টিআইএন ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সেবা দেয়ার সময় টিআইএন ভেরিফিকেশন না করলেও ওই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২৪-এ ধারা অনুযায়ী সেবা প্রদানকালে টিআইএন সনদ যাচাই না করলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে আয়কর বিভাগ। ১৬৫-এ ধারা অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কোনো ব্যক্তি জাল টিআইএন ব্যবহার করেন বা অন্যের টিআইএন ব্যবহার করেন, সে ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম কর অঞ্চলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এক টিআইএন সনদে একাধিক গাড়ি নিবন্ধনের কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ জালিয়াতির সঙ্গে অবশ্যই বিআরটিএর দালালচক্র জড়িত রয়েছে। এসব জালিয়াতিচক্রের বিররুদ্ধ কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার তৌহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এনবিআর ও বিআরটিএর মধ্যে গত সেপ্টেম্বর মাসে একটা চুক্তি হয়েছে। এর ফলে মূল টিআইএন নম্বরধারী তার ওই নম্বরে টাকা জমা দিবেন। নাম ঠিক না থাকলে সে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারবে না। এখন সব অনলাইনেই হচ্ছে। আগে একজন গ্রাহক ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গিয়ে যদি খামখেয়ালিপনায় আরেকজনের টিআইএন নম্বরে টাকা জমা দেয়, তাহলে সে দায়ভার তো গ্রাহকের উপর বর্তাবে। এখন আয়কর রির্টানের ব্যাপারে এনবিআর কঠোর অবস্থানে আছে। তাই বিআরটিএ দুটি সফটওয়্যার আপডেট করেছে। এখন আর অন্য টিআইএন নম্বরে টাকা জমা দেয়ার সুযোগ নেই।
আনন্দবাজার/এম.আর









