তিন বছরে চাহিদার ৪০ ভাগ উৎপাদন
ভোজ্যতেলের বাজার কম ভোগাচ্ছে না মানুষকে। হঠাৎ করেই কেজিতে ৩৮ টাকায় দাম বৃদ্ধি করায় বিপাকে পড়েছে নাগরিকরা। এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সরিষা, সয়াবিনসহ বিভিন্ন তেলজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই আলোকে নতুন কর্মসূচি নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণলায়। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন আগামী তিন বছরের মধ্যে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ ভাগ অর্থাৎ ১০ লাখ টন দেশেই উৎপাদনের একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে ভোজ্যতলের বিদেশনির্ভরতা কমাতে তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সভার শুরুতে কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
ভোজ্যতেলের ভরসা চাষে শিরোনামে ১৪ মার্চ দৈনিক আনন্দবাজারে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর এক সপ্তাহ পরে ২২ মার্চ ভোজ্যতেল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে চাষের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে ১৭ মে ‘ফিরতে হবে সরিষায়’ শিরোনামে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ১৮ মে সরিষার তেলের উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক তিন বছরের মধ্যে ৪০ শতাংশ তেল উৎপাদনের প্রকল্পের কথা জানান।
কৃষিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার ১২ ভাগ উৎপাদিত হয়। দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২৪ লাখ টন। এরমধ্যে তিন থেকে চার লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিটা বিদেশ থেকে আমদানি হয়। গত অর্থবছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে গত ১০ মাসে ভোজ্যতেল আমদানিতে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বাকি দুই মাসে ভোজ্যতেল আমদানির মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২৪ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, এই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছিলেন, আমাদের এত তেল কেন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ সরিষার দেশ ছিল, সেই সরিষা আমরা করতে পারি না। ভোজ্যতেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আমাদের চেষ্টা করার জন্য বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আস্তে আস্তে আমাদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে আগামী তিন থেকে চার বছরে কীভাবে তেলের উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং কতটা বাড়ানো যায়, আবার ধানের উৎপাদনও ব্যাহত করতে চাই না, এটা কীভাবে হবে সেটা নিয়েই আমরা কাজ করছি। আমরা তিন বছরের একটি পরিকল্পনা করেছি।
মন্ত্রী বলেন, গত ১০ বছর ধরে আমাদের বিজ্ঞানীরা অনেক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন করেছেন। এই যে ভোজ্যতেল নিয়ে যে একটা হাহাকার চলছে। তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। মানুষের খরচ বেড়ে গেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে, ব্যবহারের ক্ষেত্রে রিজার্ভেও প্রভাব পড়ছে। আমরা সরিষার উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছি। এই জাতগুলো যদি আমরা মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে পারি তাহলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, এক সময় সয়াবিন ছিল গরিবের তেল। বলা হতো সরিষার ঝাঁজের জন্য এতে খারাপ জিনিস আছে, শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এটা সঠিক না। এখন আমরা কীভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারি? সরিষার আগের জাত, সাধারণত এটা ৭শ কেজি তেল উৎপাদন করতে পারে, টরি-৭। আমাদের নতুন যে জাত উৎপাদন করেছে সেটার উৎপাদন দুই টনেরও বেশি, প্রায় তিনগুণ। আমাদের আমন ধানের যে নতুন জাতগুলো রয়েছে সেগুলো ১১০ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে পেকে যায়। সাধারণত এটা লাগে ১৪০ থেকে ১৬০ দিন। সময় কমে আসায় যে নতুন ধান আসবে সেটা কাটার পর সেখানে সরিষা লাগাবো। সেটা আসবে ৮০ থেকে ৮৫ দিনে। এটা কাটার পরে সেই জমিতে আমরা বোরোতে যেতে পারি। এতে সরিষাটা একটা অতিরিক্ত ফসল হলো।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, এই প্যাটার্ন ব্যবহার হয় এমন জমির পরিমাণ হলো ২০ লাখ হেক্টরে। এর শতকতা ২৫ শতাংশেও যদি আমরা সরিষা দিতে পারি তাহলেও কিন্তু বিরাট উৎপাদন বাড়ানো যাবে। এক বিঘা জমিতে কৃষক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় করতে পারবে। এটাকে আমরা কর্মসূচি হিসেবে প্ল্যান করেছি। এটাকে আমরা মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাবো। এর জন্য বীজ, সারসহ যে প্রযুক্তি আছে সেটা দিয়ে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। চর ও উপকূলে বাদাম হতো। এখনও হয়। আমরা আরও বেশি এলাকায় কীভাবে এটা করতে পারি। উপকূলে সয়াবিনও একটি নতুন ফসল। আমাদের বিজ্ঞানীরা কিছু জাত এনেছেন এগুলো নোয়াখালীর সুবর্ণচর, ভোলার চরফ্যাশন এবং বিভিন্ন এলাকায় হচ্ছে। এর তেলও ভালো। এতে প্রোটিন অনেক বেশি। এটাও একটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সূর্যমুখীও একটি নতুন ফসল হিসেবে আসছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা এক্সট্র্যাকশনের জন্য মেশিন আবিষ্কার করেছেন। এতে করে প্রতিবছর যে ২৪-২৫ লক্ষ টন তেলের প্রয়োজন হয় আমরা এর মধ্যে ১০ লাখের বেশি নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবো।
আনন্দবাজার/শহক









