খালি খরচই বাড়ে আয় বাড়ে না
কী করবো বুঝতে পারছি না। আমাদের তো দেখার কেউ নেই। আমরা বাঁচলেই কি আর মরলেই কি? রাষ্ট্রের কিছু আসে যায় না: শিমুল, জুতা সেলাইকারী, বাংলামোটর, ঢাকা
‘যেইভাবে জিনিস পত্রের দাম বাড়তাছে তাতে না খেয়ে থাকতে হইবো। এইভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে মইরা যামু। এর চয়ে গ্রামে চইলা যামু, সেখানে খরচ কম। সেখানে মালিকরা রিকশার ভাড়া কম নেয়। যা আয় করমু তা দিয়া কোনোরকম সংসার চলাইয়া নিমু’..।
কথাগুলো বলছিলেন রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার মো. মহুবার হোসেন। যাত্রী নামিয়ে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাজধানীর বাংলামটর এলাকায়। সেখানেই কথা হয় দৈনিক আনন্দবাজারের প্রতিবেদকের সঙ্গে। থাকেন লালবাগ এলাকায়।
মহুবার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা। এক ছেলে পড়ছেন অনার্সে। আরেক ছেলে একাদশ শ্রেণিতে। ছোটটি দশম শ্রেণিতে। দুই মেয়ের মধ্যে একজন অনার্সে। আরেকজন কিছুটা পিছিয়ে দশম শ্রেণিতে। সবার পড়ালেখার খরচ একাই চালাতে হয় মহুবারকে। ঘরে অসুস্থ মা। তার ওষুধ কিনতে প্রতিমাসে গ্রামে পাঠাতে হয় ৫০০ টাকা। সাত সদস্যের পরিবার চালাতে তিনি সব সম্পত্তি বিক্রি করে অনেকটাই নিঃস্ব।
মহুবার বলেন, গ্রামের বাড়িতে থাকা প্রিয় সন্তানদের পড়ালেখা বাবদ তার অনেক টাকা খরচ হয়। প্রাইভেট বাবদ এক হাজার টাকা দিচ্ছেন। তিনি যেখানে থাকেন সেখানে আগে দৈনিক খাবার খরচ দিতে হতো ১০০ টাকা। এখন সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবারের দামও বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে। যেখানে মাসে খরচ হতো তিন হাজার টাকা সেখানে এখন খরচ তিন হাজার ৬০০ টাকা। এই খরচ মেটাতে যাত্রীদের কাছে অনুনয়-বিনয় করে বাড়তি ১০-২০ টাকা চেয়ে নেন। তবে কেউ দিচ্ছেন আবার কেউ দিচ্ছেন না।
মহুবার বলেন, পরিস্থিতি আমাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করছে। রিকশা চালিয়েও মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। এছাড়া রিকশাভাড়া বাবদ প্রতিদিন ১২০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। আগে মাসে ১৩-১৪ হাজার টাকা গ্রামে ছেলেমেয়েদের জন্য পাঠাতে পারলেও এখন আর পারছি না। এখন ১০ হাজার টাকা পাঠাতেও কষ্ট হচ্ছে। ছয়জনের সংসার কি আর ১০ হাজার টাকায় চলে?
মাস খানেক পর মহুবার চলে যাবেন মফস্বল শহরে। এমন সিদ্ধান্তে কথা জানিয়ে বলেন, নোয়াখালীতে পরিচিত একজন আছেন, সেই শহরে গিয়ে রিকশা চালাবো। সেখানে রিকশা মালিককে টাকাও কম দিতে হবে। আর থাকা-খাওয়ার খরচও ঢাকার চেয়ে কম। ঢাকায় থাকলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।
রাজধানীর ঢাকার বাংলামটর এলাকায় জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন মাগুরা জেলার মো. শিমুল। থাকেন গাবতলীর একটি বাসায়। তার সঙ্গে থাকেন বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই ভাই-বোন। মোট ৫ সদস্যের পরিবারের বাসাভাড়া বাবদ খরচ চার হাজার টাকা। খাওয়া খরচ ১০ হাজার টাকা। গাবতলী থেকে বাংলামোটর আসা-যাওয়ার খরচ দিনে ৬০ টাকা। মাসে গিয়ে দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকায়। জুতা সেলাই কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী বাবদ মাসিক খরচ হাজার টাকার মতো। পরিবারের সদস্যদের জন্য অন্যান্য খরচ আরো হাজার খানেক। সব মিলিয়ে তার মাসিক খরচ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকার মতো।
শিমুল বলেন, আগের চেয়ে আয় এখন কমে গেছে। কোনো দিন ৪০০ টাকা, কোনোদিন আয় হচ্ছে ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে মাসে আয় ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেশি নয়। তবে আয়ের চেয়ে খরচই বেশি হচ্ছে। এতে ধারদেনায় পড়তে হচ্ছে। বাড়তি আয়ের কোনো উপায়ও নেই। এখন যেভাবে সবকিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কী করবো বুঝতে পারছি না। আমাদের তো দেখার কেউ নেই। আমরা বাঁচলেই কি আর মরলেই কি? রাষ্ট্রের কিছু আসে যায় না।
রাজধানীর বাংলামোটর এলাকাতে ১৯ বছর ধরে জুতা সেলাই করেন বাবু নামের একজন। বাড়ি তার হাওরের কিশোরগঞ্জে। থাকেন লালবাগ এলাকার একটি মেসে। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে বাংলামোটরে আসেন। চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস তিনি। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা থাকেন গ্রামে। প্রতিমাসে মেসভাড়া বাবদ বাবুর খরচ আড়াই হাজার টাকার মতো। খাওয়া খরচ আড়াই হাজার টাকা। বাড়িতে পাঠাতে পারেন দশ হাজার টাকার মতো। সেখান থেকে মায়ের ওষুধ বাবদ খরচ হাজার খানেক টাকা। সবমিলিয়ে খরচ পনের হাজার টাকার বেশি। তবে এখন যে হারে দ্রব্যমূল বাড়ছে তাতে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কীভাবে চলবে সংসার? খালি খরচই তো বেড়ে চলেছে, খরচ তো বাড়ে না।
বাবু আনন্দবাজারকে বলেন, এখন আর আগের মতো আয় নেই। ব্যয় বেড়ে গেছে অনেক। সবকিছু বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। নিজের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বাড়িতে আগের মতো টাকা পাঠাতে পারছি না। তারা অনেক কষ্টে আছে। কিন্তু আমার করার কিছুই নাই। এখন কী করবো তা ভাবতেও পারছি না। আপনাদের বলে কী লাভ হবে? সরকার আমাদেরকে নিয়ে ভাবে না।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার রেললাইনের পাশে পলিথিন মোড়ানো ছোট্ট একটি ছাপরা ঘর। সেখানেই স্ত্রী ও নাতি নিয়ে থাকেন জামালপুরের বাবুল মিয়া। নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে তার বসতভিটা। এখন রিকশা চালিয়ে জীবন-জীবিকা চলছে। শারিরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘসময় রিকশা চালানো তার পক্ষে সম্ভব হয় না। দৈনিক ২৫০-৩০০ টাকা আয় করেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খেয়ে না খেয়ে দিন চলে। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। কোনো রকম চালের ব্যবস্থা করতে পারলেও তরকারি আর ভাগ্যে জোটে না।
ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে দিন কাটে ৭৫ বছর বয়সী রেজিয়া বেগমের। তেজগাঁও রেললাইনের পাশে পলিথিন মুড়ানো খুপড়ি ঘরে বসবাস। সড়কের পাশ থেকে শাক খুঁজে বাজারে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ কোনো রকম চালায়। ৩০ টাকা শাক বেচে ২০ টাকায় এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) চাল কিনছি। ভাতের লগে, আলু সেদ্ধ করছি। তেল-তরকারির অনেক দাম। কেনার টাকা আমাগো নাই। আমাগোর মতো গরিব না খেয়েই মইরা যাইবো।









