গতবছর দেশে ৩৪টি হাতির অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যার শিকার হয়েছে। এতে বন বিভাগ বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা দিতে সুস্পষ্টভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছে পরিবেশবাদীরা। হাতি হত্যায় বনে অবৈধ দখলদারদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তাদের। হাতির আবাসস্থল ধ্বংস করে তাদের খাদ্যসংকট তৈরি করা হয়েছে। এখন বনভূমি দখল করতে দেশের সবচেয়ে বড় এবং বিপন্নপ্রায় প্রাণি হাতি হত্যা করা হচ্ছে বলে ছায়া তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
দেশের ৩৩টি পরিবেশবাদী সংগঠনের সমন্বিত প্রয়াস বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট (বিএনসিএ) সাম্প্রতিক সময়ে হাতির মৃত্যু নিয়ে একটি ছায়া তদন্ত করে। এই তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে মঙ্গলবার রাজধানীর স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা।
এতে তদন্ত প্রতিবেন তুলে ধরেন বিএনসিএ-এর আহ্বায়ক ও পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, হাতি আমাদের জায়গায় আসেনি। আমরা মূলত হাতির করিডোরে ঢুকে পড়েছি। হাতি রক্ষায় বন বিভাগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগের কার্যক্রম কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। হাতির মতো এত বড় প্রাণীকে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারার অর্থই হলো অন্য প্রাণীগুলোও খুবই হুমকিতে রয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের পরিবেশে।
চলতি বছরে দেশ জুড়ে হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের নৃশংস আচারণের অগণিত চিত্র উঠে এসেছে। এছাড়া দেশের বন উজার, নদী-খাল দখল, পরিবেশ দূষণের হার চরম মাত্রায় বেড়েছে। বনের পতাকাধারী প্রাণী হাতি ২০২১ সালে প্রাণ হারিয়েছে ৩৪টি।
তিনি আরো বলেন, বন এখন আর শুধু বৃক্ষ এবং বন্যপ্রাণীর জন্য নেই। বনভূমি এখন অনেক মানুষের হীন স্বার্থের সংগে জড়িয়ে গেছে। বন, বনভূমি এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা দিতে বন বিভাগের ক্রমাগত ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠছে। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এতদিন তারা বনভূমি বেদখলে সহযোগিতা করেছে। বনকে নিজেরাও বাণিজ্যমুখী করেছে। যার কারণে আজকের পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। বন-বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এই বিভাগের মূল ম্যান্ডেট হওয়ার কথা অথচ তারা প্রকল্প দিয়ে বন-বন্যপ্রাণী রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটাও লুটপাট হয়ে যাচ্ছে।
প্রকল্প শেষ হলেই ক্ষতিতে পড়ছে বন্যপ্রাণী। টাকা ফুরালেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষের অক্সিজেন চেম্বার, হারাচ্ছে বনের রক্ষক বন্যপ্রাণী। বর্তমানে বনভূমির যেই অবস্থান এতে সৃষ্ট সংকট বন অধিদফতরের একার পক্ষে সমাধান করা অসম্ভব। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগের বিকল্প নেই।
লিখিত বক্তব্যে কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বিএনসিএ কক্সাবাজারে ছায়া তদন্তে গিয়ে দেখতে পায়, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের পানেরছড়া ও ধোয়াপালং রেঞ্জের ১৩,০৬৫ একর বনভূমির মধ্যে অর্ধেকের বেশি অবৈধ দখলে চলে গেছে। যদিওবা বন বিভাগ বনভূমি বেদখলের পরিমাণ উল্লেখ করছে ১২০২ একর। এর উপর চারপাশে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বনভূমির উপর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় হাতি চলাচলের পথ (করিডোর) ও আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় আনুমানিক ১০০ একর জায়গায় প্রায় ৪০টি মতো হাতি আটকে পড়েছে।
বনভূমিতে অবৈধ বসতবাড়ি, পানের বরজ, বিভিন্ন খেতখামার, ঘের, বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য চরম হুমকি তৈরি করেছে। সেখানেও হাতির নিরাপদ আবাস, খাদ্য ও পানির সংকট তীব্র হওয়ায় এসব হাতি একপ্রকার উপায়হীন হয়ে মানুষের বসতবাড়ি ও খেতখামারে প্রায় প্রতিদিন হানা দিচ্ছে। এতে উক্ত এলাকায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে হাতি হত্যার মতো ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া ধোয়াপালং রেঞ্জের পাশের পানেরছড়া রেঞ্জের তুলাবাগান বন বিট এলাকায় ২০২০ সালেন নভেম্বর মাসে একটি হাতিকে বিদ্যুতায়িত করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে রামু থানায় একটি মামলা দায়ের করে বন বিভাগ। কিন্তু তদন্ত করে মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার সময় মামলার বাদি সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তা এক আসামীর সাথে যোগসাজশে অভিযোগপত্র থেকে এক আসামীকে বাদ দেয়ার সুযোগ তৈরী করে দেয়ার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় ওই বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছে কক্সবাজার সচেতন নাগরিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠন।
অপরদিকে, শেরপুরের শ্রীবর্দী এবং ঝিনাইগাতি এলাকায় ছায়া তদন্তে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার বনভূমিতে ব্যপক মানুষের অবৈধ বসবাস রয়েছে। অবৈধ বসবাসকারীদের মাঝে হাতিবিদ্বেশী মনোভাবও আমাদের নজরে এসেছে।
শেরপুরে হাতির কোরিডোর এলাকায় ২০১৭ সালে প্রকল্পের মাধ্যমে সোলার ও বায়োডাইভারসিটি ফেন্সিং সংযোজন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প শেষ হতেই সেটি অকেজো হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হাতির বিচরণ এলাকা মালাকোচায় কোনো হাতি সংরক্ষণ দল দেখা যায়নি। স্থানীয় রেঞ্জ কর্মকর্তাকে বেশ উদ্দমী এবং আগ্রহী মনে হয়েছে। তবে তার এবং স্থানীয় বন বিভাগের একার পক্ষে পুরো পরিস্থিতি যে সামাল দেওয়া যে সম্ভব নয় বলে মনে করছে তদন্ত দল।
বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিএনসিএ ১১ দফা পরামর্শ তুলে ধরা হয়। সেগুলো হচ্ছে: ১) বন, বনভূমি এবং বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা ২) বিচারের আওতায় না আসা হাতি হত্যার ঘটনাগুলো সিআইডি বা পিবিআইকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা, ৩) বনভূমি থেকে অবৈধ দখলদারদের সরানো। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানান্তর করা, ৪) বন-বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনিক বডিগুলোর সমন্বয়হীনতা দূরকরা, ৫) বাণিজ্য ছেড়ে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা বন বিভাগের মূল ম্যান্ডেট নিধারণ করা, ৬) প্রকল্পভিত্তিক সংরক্ষণ বাতিল করে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগকে নিয়মিত বাজেটে বরাদ্দ দেয়া, ৭) বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য গণমাধ্যমকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা, ৮) সংরক্ষিত বন ও হাতির কোরিডোরের ভেতর বিদ্যুৎ লাইন, সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে বরাদ্দ বন্ধ করা এবং অতীতে দেওয়া সড়ক ও বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা, ৯) হাতি হত্যার আসামিদের জামিন বন্ধ করে এবং সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, ১০) বন বিভাগে দ্রুত পর্যাপ্ত জনবলসহ সব প্রয়োজনীয় সুবিধা যুক্ত করা ও অ্যালিফেন্ট রেস্পন্স টিমকে বেতনভুক্ত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং ১১) সংরক্ষিত বনকে আর কোনো সরকারি, বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির জন্য বরাদ্দ না দেওয়া।
সভায় জোটের অংশীদার সেভ আওয়ার সি’র মহাসচিব মুহাম্মদ আনোয়ারুল হকের উপস্থাপনায় এই সংবাদ সম্মেলনে বিশেষঞ্গ হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ প্রাণীবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জসীম উদ্দিন, প্রতিবেশ বিশেষজ্ঞ আব্দুল ওহাব। তদন্ত দলের সদস্য এনভায়রনমেন্ট পিপল এর সভাপতি রাশেদ উল মাজীদ, জোটের সদস্য নোঙ্গর এর সভাপতি শামস সুমন প্রমুখ।
আনন্দবাজার/শহক









