রুটি-রুজি বন্ধ কোটি মানুষের
পাটকল, কাগজের কল, হার্ডবোর্ড, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়েই খুলনা হয়ে উঠেছিল শিল্পনগরী। পাট, কাগজ আর হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ হওয়ার কারণে খালিশপুর, দৌলতপুর, শিরোমনি, আটরা শিল্পাঞ্চল তার গৌরব হারিয়েছে। শিল্প হারিয়ে এখন অনেকটাই মৃত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে খুলনা। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী অন্তত ৫ কোটি মানুষের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া খালিশপুর জুটমিলসহ ৫টি পাটকলের শ্রমিকরা পাওনা টাকা না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
স্বাধীনতার পর খুলনা শিল্পাঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল ছিল ১৭টি। তবে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির ফলে একে একে বন্ধ হতে থাকে এসব পাটকল। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি পাটকলের খুলনাতেই অবস্থান ৯টির। তবে অব্যাহত লোকসান আর ভর্তুকির কারণে সরকার ২০২০ সালের ৩ জুলাই এসব পাটকল বন্ধ করে দেয়। যার মধ্য দিয়ে খুলনা শিল্পাঞ্চলের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণেই খুলনার পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। যে অনিয়মে বিজেএমসির কিছু কর্মকর্তারা জড়িত ছিল বলে জানান খুলনা ওয়ার্কাস পার্টির নেতা কমরেড খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে বিজেএমসির অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিলেই পাটকল বন্ধের অনেক তথ্য বের হয়ে আসবে। তিনি আরো বলেন, সরকারের হিসাবে গত ৪৪ বছরে পাটকলে লোকসান ১০ হাজার ৬শ কোটি টাকার মতো। অথচ অনেক দপ্তর আছে যেখানে এরচেয়েও বেশি লোকসান হয়।
পাট-সুতা-বস্ত্রকল সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা জাকির হোসেন বলেন, পাটকলে দুর্নীতি ছাড়াও যথার্থ পরিকল্পনার অভাবেও লোকসান হয়েছে। একদিকে প্রতি বছর পাটের ভরা মৌসুমে পাট কেনার অর্থ ছাড় দেওয়া হতো না। পাট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজসে টাকা আটকে রাখা হতো। সেই সময়ে পাট ব্যবসায়ীদের গুদামে চলে যেতো। এসব পাট ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে কলে সরবরাহ করতো। তখনই অর্থ মন্ত্রণালয় আর বিজেএমসি পাট খাতে অর্থ ছাড় দিত। মিলগুলোকে তখন দ্বিগুণ দামে পাট কিনতে হতো।
প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ সভাপতি শাহানা শারমিন জানান, অব্যাহত লোকসানের অজুহাতে বিজেএমসি ২০২০ সালের জুলাইয়ে খুলনার ৯টিসহ দেশের ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে। পরে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, প্রোভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুইটির টাকা পরিশোধ শুরু করে। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। বাকিদের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে গেটপাশের নামের মিল না থাকা এবং বিভিন্ন জটিলতার কারণে পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে।
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানী বলেন, নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে প্রায় ২০ হাজার স্থায়ী শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। ইতোমধ্যে উৎপাদিত সব পণ্য বিক্রি হয়ে গেছে। নগদ ৭৩৭ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রের ৫২০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
বিজেএমসির চেয়ারম্যান মুহম্মদ সালেহউদ্দীন জানান, মিলগুলো ব্যক্তি মানিকানায় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সে প্রক্রিয়া অব্যহত রয়েছে। অবিলম্বে সরকারি অর্থায়নে মিল চালুর দাবি জানিয়েছেন পাটকল রক্ষা সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা।









