প্রকৃতির ঐকতানে টেকসই জীবন--
জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা চূড়ান্ত
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বসেছে পরিমাপক যন্ত্র
পরিবেশ দূষণ রোধ ও দূষণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অনলাইন তরল বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করছে সরকার। কালো ধোঁয়া, ইটের কালো ধোঁয়া, উন্নয়নের কারণে দূষণ এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলো যে দূষণ করছে এর পুরোটাই ইটিপির আওতায় নিয়ে আসবে। একই সঙ্গে মনিটরিং পদ্ধতিও অনলাইনে নিয়ে আসা হবে। যাতে করে অফিসে বসেই দেখা যায় ইটিপিগুলো চালাচ্ছে কি না। সরকারের এসব উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ুমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন।
গাড়ির কালো ধোঁয়ার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতায় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর অধীনে কালো ধোঁয়া পরিমাপক যন্ত্র বসিয়ে সেটাকে মাপা হবে। এটার তথ্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে দেয়া হবে, যাতে সেই গাড়ি আর ফিটনেস না পায়। এ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, এরই মধ্যে বায়ুদূষণ রোধে বিধিমালা করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী সংসদে পাস হলে বায়ুদূষণ রোধ করতে সরকারের যা করণীয় তা করা হবে। ইতোমধ্যে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পরিমাপক যন্ত্র বসানো হয়েছে।
ইটভাটাগুলোকে এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন আইন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি সব স্থাপনায় পুরোনো ইট ব্যবহার করা হবে না। পুরোনো ইট বায়ু দূষণ ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে মাটিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে পুরোনো ইট বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন আইনের প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। আগামী ২০২৫ সালে পুরোনো ইটের বদলে ব্লক ইট ব্যবহার হবে। যাতে দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছে সরকার।
ইটভাটা সৃষ্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিজমির উর্বর মাটি রক্ষার লক্ষ্যে সরকার ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)' জারি করেছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৫১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ২ হাজার ৫৯৪টি ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮২৮টি অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ বা কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে এবং ৬২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
পরিবেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমের অধীন পরিবেশ অধিদপ্তর জলাশয় ভরাট, পাহাড় বা টিলা কর্তন, কৃষিজমির ক্ষতি, নদীর পানিদূষণ, বায়ুদূষণসহ পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতির জন্য দূষণকারী ৯ হাজার ৪১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। নতুন পরিবেশ বিধিমালা সম্পর্কে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ আইনের সঙ্গে দূষণমুক্ত একটি বিধিমালা প্রণয়ন করব। তাতে বায়ু দূষণ হচ্ছে যেসব কারণে সেগুলো বন্ধ করতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আইনে বিস্তারিত থাকবে।
বর্তমানে দেশে বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ মোট ভূমির ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং বনাচ্ছাদন ১৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন ২৫ শতাংশে এবং বনাচ্ছাদনের পরিমাণ মোট ভূমির ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে বনায়ন ও বন সংরক্ষণ, অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার এবং টেকসই বন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলছে।
সরকারি তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বন অধিদপ্তর ৪ হাজার ৭২৯ হেক্টর বনভূমি জবরদখল মুক্ত করে বনায়ন করেছে। বর্তমানে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন অধিদপ্তর প্রায় ৭ হাজার ২২০ হেক্টর সমতল ভূমি ও শালবন পুনরুদ্ধার, ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৮০ হেক্টর পাহাড়ি বন পুনরুদ্ধার, ৫০০ হেক্টর আগর বন, ১৫ হাজার কিলোমিটার দ্বীপ বাগান, ৫০ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানসহ অন্যান্য বাগান করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বনভূমি থাকা আবশ্যক। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বনভূমি সৃজন কষ্টসাধ্য। বনাচ্ছাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ম্যানগ্রোভসহ ২৯ হাজার ১২৪ হেক্টর ব্লক বাগান এবং গোলাপাতাসহ ১ হাজার ৫৭৪ কিলোমিটার দ্বীপ বাগান করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ুমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা ও মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পরিবেশ দিবসের কর্মসূচি
আগামীকাল ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেলা ১১টায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন। একই সঙ্গে ৫ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত পরিবেশ মেলা ও ৫ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করবেন।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে অনলি অন আর্থ: লিভিং সাসটেইনেবিলিটি ইন হারমনি উইথ ন্যাচার, এর ভাবানুবাদ হয়- একটাই পৃথিবী: প্রকৃতির ঐকতানে টেকসই জীবন। জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- বৃক্ষ-প্রাণে প্রকৃতি প্রতিবেশ, আগামী প্রজন্মের টেকসই বাংলাদেশ।
আনন্দবাজার/শহক









