যৌন নিপীড়ন- আঁচলের সমীক্ষা---
- বিকৃত যৌন ইচ্ছার শিকার ৩৫.৪৯ ভাগ
- শৈশবে নিগ্রহের শিকার ৩৮.৮৬ ভাগ
সমাজের অংশ হিসেবে নারীদের যতটুকু সম্মান পাওয়া উচিত সেটা আধুনিক সময়ে এসেও তাদের নেই। ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এ অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দেশে তরুণীদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫৮ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন। এর মাঝে ৩৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বিকৃত যৌন ইচ্ছার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা কুদৃষ্টির মাধ্যমে নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। আর আপত্তিকর স্পর্শের ভুক্তভোগী হতে হয়েছে ২৯ দশমিক ৬২ শতাংশ ও বিভিন্ন জায়গায় ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয়েছে ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ তরুণীকে। গতকাল শনিবার আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘তরুণীদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব’ শীর্ষক সমীক্ষার ফলটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির ইতোপূর্বে করা জরিপগুলো থেকে জানা যায়, তরুণ অপেক্ষা তরুণীরা অধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে আঁচল ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে একটি জরিপের আয়োজন করে। এই জরিপে অংশগ্রহণকারী ১ হাজার ১৪ জন শিক্ষিত তরুণীদের থেকে তারা কতটা বৈষম্য, লাঞ্ছনা, যৌন হয়রানি, সমাজ ও পরিবারে প্রতিবন্ধকতা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছেন ও এই সকল বিষয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছে তা তুলে ধরা হয়।
জরিপে অংশগ্রহণ করে সারাদেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণী। অংশগ্রহণকারী তরুণীদের ভেতর অবিবাহিত ৮৮ দশমিক ১৭ শতাংশ ও বিবাহিত ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং বাকীরা আর সংসার করছেন না।
অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক, ড. কাবেরী গায়েন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহীন মোল্লা, সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সুরঞ্জনা সাহা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, মিডিয়া কম্যুনিকেশনের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা রঞ্জনা এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ।
পারিবারিক টানাপোড়েন
সমীক্ষায় জানানো হয়, পারিবারিক টানাপোড়েন তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সর্বাধিক প্রভাব ফেলেছে। এ সংখ্যা ৩১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর্থিক অস্বচ্ছলতা অংশগ্রহণকারীদের ২৪ দশমিক ৪৬ শতাংশের মনে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। বেকারত্বের কারণে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ততার শিকার হন। ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার মাধ্যমে ও ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ তরুণী যৌন নিপীড়ণের কারণে মানসিকভাবে প্রভাবিত হন।
পারিবারিক টানাপোড়েনের পিছনের কারণ খোঁজে জানা যায়, পারিবারিক আর্থিক অস্বচ্ছলতা ৩০ দশমিক ৭২ শতাংশ তরুণীর মনে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাবা, মা বা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া ২৭ দশমিক ৩২ শতাংশের মনে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। সেই সাথে পরিবার থেকে অযাচিত চাপের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ততার শিকার হয়েছেন ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ নারী।
বিয়ের অযাচিত চাপ বাড়ছে
২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ তরুণীর অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও পরিবার থেকে বিয়ের চাপের সম্মুখীন হন। তাদের মধ্যে ১০৯ জনের পরিবার পরবর্তীতে বিয়ে না হওয়ার ভয় সৃষ্টি করেন। কমবয়সী মেয়েদের ভালো বর হয় এরূপ ধারণার কারণে ৮৬ জনের উপর পারিবারিকভাবে বিয়ের চাপ আসে। করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষাবর্ষ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ৮৫ জনকে বিয়ের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
বডি শেমিং করায় এগিয়ে আত্মীয়রা
৬৯ দশমিক ৯২ শতাংশ তরুণী শারীরিক অবয়ব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ২৪ শতাংশ শরীরের আকৃতি, গঠন এবং অবয়ব নিয়ে আত্মীয়দের কথা ও ইঙ্গিতে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন। বন্ধু-বান্ধবের কাছে বডি শেমিংয়ের শিকার ২২ শতাংশ। এমনকি পরিবার থেকে এ ধরণের মন্তব্য শুনেছেন ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। পথচারীর মাধ্যমে ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ তরুণী। আঁচল ফাউন্ডেশন জানায়, ওজনের কারণে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হয় বলে ৩৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ তরুণী। গায়ের রঙের কারণেও ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ, উচ্চতা, মুখাবয়বের গঠন ও দাগ, কণ্ঠস্বর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তরুণীরা বিরূপ মন্তব্য শুনে থাকেন।
বেশি অনিরাপদ বাসে
দেশে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও বিভিন্ন প্রয়োজনে নারীরা গণপরিবহন ব্যবহার করে থাকেন। সমীক্ষা অনুযায়ী ৪৫ দশমিক ২৭ শতাংশ তরুণী গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হন। বাস বা বাসস্ট্যান্ডে যৌন হয়রানির মতো অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হন ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ তরুণী। রেল বা রেল স্টেশনে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ তরুণী যৌন হয়রানির শিকার হন।
আপত্তিকর স্পর্শের শিকার
গণপরিবহণে যৌন হয়রানির মধ্যে আপত্তিকর স্পর্শের শিকার হন ৬৪ দশমিক ৯২ শতাংশ তরুণী। ২০ দশমিক ০৪ শতাংশ কুদৃষ্টি এবং অনুসরণের শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়। একাকী চলার সময়ে ৭৫ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়রানীর শিকার হন। তবে ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ মা, বোন, বান্ধবী বা অন্য নারী সঙ্গী থাকা অবস্থায় এবং ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বাবা, স্বামী, ভাই বা অন্য পুরুষ সঙ্গী থাকা অবস্থায় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
শৈশবে যৌন হয়রানি
৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ তরুণী শৈশবে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। আত্মীয়-স্বজনের দ্বারা ৩৫ দশমিক ২৮ শতাংশ যৌন নিগ্রহমূলক আচরণের শিকার হন। শৈশবে অপরিচিত ব্যক্তিবর্গের দ্বারা ভুক্তভুগী হন ২৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
ছবি নিয়ে বিড়ম্বনা
অনলাইনে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন ৪৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ তরুণী। অবান্তর ও কুরুচিপূর্ণ মেসেজ পাঠিয়ে এবং মন্তব্য করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে ৬১ দশমিক ১২ শতাংশকে। আইডি হ্যাকিং-এর শিকার ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ আর ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ছবি নিয়ে দুর্ভোগ পড়েন। প্রফেসর ড. কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, সমাজের একটি অংশ হিসেবে নারীদের যতটুকু সম্মান বা মর্যাদা পাওয়া উচিত সেটা আধুনিক সময়ে এসেও এখনো নেই। ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এ অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সুরঞ্জনা সাহা বলেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি আস্থার প্রতীক হলেও সামাজিক অশুভ প্রয়োগ ও ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতার দরুণ অনেক নারীর কাছে তা এক আতঙ্কের নাম।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বলেন, নারীদের মানসিকভাবে ভালো ও আত্মহত্যার হাত থেকে রক্ষা করতে চাইলে সমীক্ষার ফলগুলোর সঠিক সমাধান করতে হবে।
নারীদের সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষায় সমীক্ষায় প্রাপ্ত সমস্যা সমাধানে ৯টি প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো-
১. তরুণীদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিতে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২. নারীর বিচরণক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্ব স্ব বিচরণক্ষেত্রগুলোকে আইনী বাধ্যবাধকতার আওতায় নিয়ে আসা।
৩. গণপরিবহন (বাস, রেল, রাইড শেয়ারিং) ও তার স্টপেজগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন।
৪. ইভটিজিং ও যৌন হেনস্তার মতো ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিক সমাধান পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর ভূমিকা রাখা।
৫. শৈশবকালীন যৌন হেনস্তা, বডি শেমিং থেকে রক্ষা করতে পরিবারগুলোকে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেয়া।
৬. নারীর প্রতি বিভিন্ন নেতিবাচক ধারণা ও কুসংস্কার দূর করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা জোরদার করা।
৭. নারীর সুরক্ষায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উপর মনিটরিং জোরদার করা।
৮. সকল যানবাহনকে ট্র্যাকিং এর আওতায় আনা যেনো যেকোন সময়ে যাত্রী তার অবস্থান অন্যদের জানানোর মাধ্যমে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।
৯. নারী শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মরক্ষামূলক ট্রেনিং প্রদান করা।









