- দীর্ঘ হচ্ছে প্রাদুর্ভাব, বাড়ছে আক্রান্ত-মৃত্যুহার
- প্রতিদিন রেকর্ড ভেঙে হাসপাতালে রোগি
বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। এমতাবস্থায় সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গি বা প্রচলিত ভাষায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। তবে এবারে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সংক্রমণের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী দেখা যাচ্ছে।
সর্বশেষ গত শনিবার সকাল আটটা থেকে রবিবার সকাল আটটা পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ৮৫৫ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর এক দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড এটি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গু পরিস্থিতির তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২৫ হাজার ১৮১। এর মধ্যে ঢাকায় ভর্তি রোগী ১৮ হাজার ৪৪৭ ও ঢাকার বাইরে ভর্তি রোগী ৬ হাজার ৭৩৪ জন।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৯৪ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মহানগরে মারা গেছেন ৫২ জন এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় ৪২ জন। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৮৯ জন। গত সেপ্টেম্বরে দেশে ৯ হাজার ৯১১ জন আক্রান্তের মধ্যে ৩৪ জন মারা গিয়েছিলেন। এ বছরে এখন পর্যন্ত ২২ হাজার ২৪০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু বাংলাদেশে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এতে মৃত্যুও হচ্ছে। গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৮ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
এবার যেসব রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন তাদের অধিকাংশ ডেন-থ্রি সেরোটাইপ বা ডেঙ্গুর 'তৃতীয়' ধরণে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আহমেদুল কবির। কোথাও কোথাও ডেন-ফোরের উপস্থিতও পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
মূলত, যারা আগে এক বা একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা ডেন-থ্রি এবং ডেন-ফোরে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি জটিল রূপ নেয়ায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগও ডেন-থ্রি ও ডেন-ফোরে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। একারণে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার কথা বলেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে যেখানে ডেঙ্গু হয়নি সেখানেও এখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
তাছাড়া হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ রোগী আগেও এক বা একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলেন। তাই এবারের লক্ষণগুলো প্রকট। তবে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দিতেই হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কোন প্যানিক তৈরি করতে নয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, যেহেতু এটি নিয়মিত বাড়ছে কোনও রোগীকে যেন বিনা চিকিৎসায় বাড়ি ফিরে যেতে না হয় সেজন্য আমরা সরকারি হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। তারা প্রয়োজনীয় জনশক্তি, বেড এবং লজিস্টিকস সাপোর্ট তৈরি রাখবে।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হল শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হওয়া। অনেক সময় চোখের সাদা অংশে রক্ত জমাট হতে দেখা যায়। অনেক রোগীর মধ্যে শ্বাস কষ্ট, পেট ব্যথা, বমি, মল বা প্রস্রাবের সাথে এমনকি নাক মুখ থেকে রক্ত যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
ডেঙ্গু আগে শুধু ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী শহর কেন্দ্রিক রোগ হলেও এখন এটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেখানে উন্নয়ন কাজ ও নির্মাণ কাজ চলছে। সেক্ষেত্রে দেশজুড়ে সামগ্রিক কর্মকৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই কর্মকৌশল শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয় বরং যেখানে নগরায়নের বৈশিষ্ট্য আছে যেমন দেশটির সাড়ে তিনশ পৌরসভায় এই কার্যক্রম চালাতে হবে। এজন্য প্রতিটি পৌরসভায় কীটতত্ত্ববিদ এবং মশা নিধনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধ সরবরাহ করার কথা জানান তিনি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশেষ করে বৃষ্টিপাত যদি আরও দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয় এবং থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ে তাহলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলতি বছরের শেষ সময় পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে তিনি বলেন। তিনি বলেন, এখন থেকেই যদি ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে সামনের দিনগুলোতে আমাদের একটি জটিল ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতে পার। তাই সরকারের উচিত অন্যান্য সংক্রামক রোগের মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কর্মকৌশল হাতে নেয়া।









