কলারবাগান তছনছ, ব্যাপক ক্ষতির মুখে চষিরা
কলা চাষের জন্য উত্তরাঞ্চলে বিখ্যাত জেলা বগুড়া। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। কিন্তু হঠাতই সর্বনাশ। গত সোমবার ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে শতশত জমির কলা গাছ দুমড়ে মুচড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উপজেলার উথুলি বেড়াবালা গ্রাম ও আশপাশের এলাকায়।
সরোজমিনে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গ্রামের প্রতিটি জমি আবাদী কলার গাছগুলো ভেঙে পড়ে আছে। অধিকাংশ গাছেই রয়েছে প্রায় পরিপক্ব কলার কাঁদি। কলা চাষে ভরপুর বেড়াবালা গ্রামে এখন হতাশার সুর। প্রতিটি কলা চাষের জমিতে পড়ে ভেঙে পড়ে আছে কলাগাছ। এই এলাকার প্রায় ১৫শতাংশ মানুষ কলা চাষ নির্ভরশীল। কেউ নিজের জমিতে চাষ করেন আবার কেউ চাষ করেন বর্গা বা পত্তন নিয়ে। অনেক জমিতে বিক্রয়যোগ্য হয়েছিল কলা। কেউ পরের দিনই কলা কাটতেন আবার কেউ কাটতেন কয়েকদিন পর। এরই মাঝে সিত্রাংয়ের প্রভাবে স্বপ্ন এখন ধুলিস্যাৎ। বাধ্য হয়ে লোকসানেই বিক্রি করতে হচ্ছে কলাগুলো। কলাচাষীরা জানান, প্রতিবিঘা জমিতে কলা চাষ হয় প্রায় ৩শ কাঁদি। পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় প্রতি কাঁদি ৫শ থেকে ৬শ টাকায়। সেই হিসেবে প্রতিবিঘায় উৎপাদিত ৩শ কলা কাঁদি বিক্রি হয় সর্বনিম্ন দেড় লক্ষ টাকায়। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে আকস্মিকভাবে কলাচাষে এমন সর্বনাশে দিশেহারা হয়েছেন সাধারণ চাষীরা।
বেড়াবালা গ্রামের আশরাফুল বলেন, ‘ঋণ করে আমি দেড় বিঘা জমিতে ৪শ কলা আবাদ করেছি, তারমধ্যে এক রাতে ভেঙে গেছে প্রায় ২শ কলার গাছ। হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার প্রতি কাঁদি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২শ টাকায়। এতে কমপক্ষে ১লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে আমার। এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবো, বুঝতে পারছি না।’ কান্নায় জড়িত কণ্ঠে অপর চাষী জাহানারা বেগম জানান, ‘পত্তন নিয়ে কলা চাষ করেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে জমিতে এসে দেখেন প্রায় ১৪শ কলার গাছ ভেঙে পড়ে আছে তার। লক্ষাধিক টাকা খরচ করে আবাদ করেছেন। সব টাকা লোকসান হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন পরিবার নিয়ে।’ এরকম শতশত কলাচাষীর আর্তনাদের যেন শেষ নেই।
গ্রামের রাস্তাগুলোতে ভ্যানভর্তি কলা চোখে পড়েছে দিনব্যাপী। ভেঙেপড়া কলাগুলোই বাধ্য হয়ে লোকসানেই বিক্রি করতে হচ্ছে পাইকারী বাজারে। কলার হাট নামে বিখ্যাত শিবগঞ্জ উপজেলার ফাঁসিতলা ও চন্ডীহারা। দিনব্যাপী ভেঙেপড়া কলার চাপ লক্ষ্য করা যায় সেখানে। পাইকাররা জানান, ঝড়ে ভেঙে পড়া কলাগুলো পরিপক্ব নয় এবং যেগুলো পরিপক্ব সেগুলোও ভেঙে পড়ায় অবস্থা ভালো নেই। একারণেই চাষীদের প্রকৃত দাম দিতে পারছেন না তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে, বগুড়া জেলায় সারা বছর প্রায় ১ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। এর মধ্যে শিবগঞ্জে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে পাঁচ হাজার চাষি কলা চাষ করেন প্রতিবছর। উপজেলার অসংখ্য পরিবার কলা চাষের উপরই নির্ভর করেন। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে এলাকাদুটোতে সপ্তাহে দুই দিন করে বসে কলার জমজমাট হাট। বাংলার চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসই মুলত কলার মৌসুম। ওই সময় এখান থেকে প্রতি হাটবারে প্রায় শতাধিক ট্রাক কলা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায় বলেও জানান চাষিরা।
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মুজাহিদ সরকার জানান, প্রাকৃতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন চাষীরা। তাদের নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং পরবর্তী ফসল যেন ভালো ও মজবুত হয় সেভাবে পরামর্শ দেওয়া হবে সরকারী উদ্যোগে।









