বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের জন্য হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ'র দরকার হলেও সেটি পাওয়া যাচ্ছে না বলে রোগীর স্বজনদের বেশ জোরালো অভিযোগ।
তবে রোগী দিন দিনই বাড়ছে বলে সরকার কোভিড-১৯ চিকিৎসার হাসপাতালও বাড়িয়েছে, কিন্তু ওই সব হাসপাতালের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শয্যাই এখন খালি পড়ে রয়েছে। রোগীর সংখ্যার সাথে মৃতের সংখ্যাও যখন বেড়ে চলছে, তখন হাসপাতালে শয্যা খালি কেন- জানতে চাইলে হাসপাতালগুলোর কর্তারা জানান, এখন রোগীদের মধ্যে রোগের তীব্রতা কম বলে তারা বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, হাসপাতালে আসতে হচ্ছে না।
তবে রোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, অব্যবস্থাপনার নানা খবর দেখে ও শুনে হাসপাতালে গিয়ে দুর্ভোগ পোহানোর আশঙ্কায় তারা ওমুখো হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, করোনাভাইরাস প্রকোপের শুরুতে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা রোগীদের হাসপাতালে যেতে অনাগ্রহী করে তুলেছে।
অপরদিকে গুরুতর রোগীদেরও হাসপাতালে না যাওয়ার প্রবণতা তাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা।
বিশ্বে মহামারী রূপ নেওয়া কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে ঘটার পর মৃদু লক্ষণ –উপসর্গ দেখা দিলেই রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হতে উদগ্রীব হয়ে যেতেন। শুরুতে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়।চট্টগ্রামেও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে আটটি হাসপাতালকে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব সরকারি হাসপাতালকে নন-কোভিড রোগীদের পাশাপাশি কোভিড-১৯ রোগীদের সেবার জন্য আলাদা ইউনিট খুলতে নির্দেশনাও দেয়।
শনাক্ত রোগীর সংখ্যা যখন প্রায় ২ লাখ ছুঁইছুই, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে কোভিড হাসপাতালগুলোতে যে শয্যা সংখ্যা রয়েছে, তার ৭০ দশমিক ৯৯ শতাংশই খালি পড়ে থাকছে। এক সময় আইসিইউর জন্য কোভিড-১৯ রোগীদের হাহাকার চললেও এখন সেখানেও শয্যা খালি থাকছে ৪৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
অপরদিকে আইসিইউতে শয্যা জোগাড় করতে মানুষ যখন হন্যে হয়ে খুঁজছেন, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে বহু আইসিইউ শয্যা খালি রয়েছে।
রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, করোনা রোগীদের জন্য ‘ডেডিকেটেড’ হাসপাতালে ১৪ হাজার ৬৬৮টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছেন ৪ হাজার ২৫৪ জন, খালি পড়ে রয়েছে ১০ হাজার ৪১টি শয্যা।
অন্যদিকে ৩৭৪টি আইসিউ শয্যার বিপরীতে ২১০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন, খালি পড়ে আছে ১৬৪টি।
ঢাকার ধানমণ্ডির বাসিন্দা তারেক আজিজ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন গত মে মাসে। লক্ষণ-উপসর্গ বিবেচনা করে তিনি শুরুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করলেও পরে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত বদলান তিনি।
অন্য একজন রোগী জানান, “ওই মুহূর্তের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি ভীত ছিলাম।
হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রতিদিন গণমাধ্যমে এসেছে। চিকিৎসক যারা চিকিৎসা দেবেন, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীও ছিল না।
“হাসপাতালে ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৭-৮ জন রোগী মারা যাচ্ছেন। তাদের লাশ সরানোর জন্য পর্যন্ত কেউ থাকছে না। এমন অবস্থায় আমি বাসাতেই চিকিৎসা শুরু করলাম নিজের। দ্বিতীয় নমুনা পরীক্ষায় রেজাল্ট নেগেটিভ আসে।”
কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সমন্বয়ক ডা. শিহাব উদ্দিন জানান, “কোভিড-১৯ আক্রমণের শুরুতে যে হারে জটিলতা ছিল, তা এখন কমতে শুরু করেছে। তাই হয়ত রোগীর সংখ্যা কম।”
তবে গুরুতর রোগীদের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকির দিক দেখিয়ে বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য ডা. রফিকুল জানান, “যেসব রোগীর লক্ষণ-উপসর্গ প্রবল মাত্রায় রয়েছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
“অনেক রোগীর পরিবার বাসাতেই অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে তাদের অক্সিজেন দিচ্ছেন। এতে বিপরীতটাও হতে পারে। স্যাচুরেশন লেভেল অনুযায়ী রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। তাদের হাসপাতালে আসতেই হবে।”
আনন্দবাজার/এফআইবি









