- ১০ বছরে বন্ধ ৩৫ শিল্প প্রতিষ্ঠান
- বেকার সাড়ে ৪ লাখ শ্রমিক
রংপুর বিভাগ হওয়ার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নতুন করে ভারী শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে এগিয়ে আসছেন না বেসরকারি উদ্যোক্তারাও। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চান না বলেই বড় প্রকল্পে ঋণ দেওয়া যাচ্ছে না। অপরদিকে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ভুল ধারণার কারণে কলকারখানা গড়ে উঠছে না।
রংপুরের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, সরকারের অবহেলা আর দেশের বিশিষ্ট শিল্পতিদের সুদৃষ্টি না থাকার কারনেই রংপুরে গড়ে উঠছে না কোন শিল্পকারখানা। অনেক আন্দোলন, সভা, সেমিনার করেও আমরা ফল পাচ্ছি না। শিল্প কারখানা গড়ে তোলার ফাইল থাকছে লাল ফিতায় বন্দি।
গ্যাস না থাকায় রংপুর বারবার অবহেলিত থাকছে বলে মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগর শাখার সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু। তিনি বলেন, মঙ্গাকবলিত রংপুর থেকে মঙ্গা শব্দটি দূর হলেও এখনো আমরা বঞ্চনার শিকার। তা না হলে প্রধানমন্ত্রী রংপুরের পূত্রবধু হওয়া সত্তে¡ও কেন এ সরকারের ১০ বছরে গড়ে উঠলো না ভারি কোন শিল্প কারখানা। উপরন্ত বন্ধ হয়েছে প্রায় ৩৫টি ছোট বড় শিল্প কারখানা। বেকার হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষাধিক শ্রমিক।
ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যাংক ঋণের অনিশ্চয়তা, উৎপাদিত পণ্যের বিপণন সমস্যা ও গ্যাস না থাকায় পুরনো শিল্প-কারখানাগুলোও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গেল এক দশকে ৩৫টি ভারী শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়েছেন প্রায় তিন লাখ শ্রমিক।
রংপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় মোট ভারী ও মাঝারি শিল্প-কারখানা ছিল ৬৫টি। এর মধ্যে হিমাগারই রয়েছে ৩৮টি। গেল ১০ বছরে বন্ধ হওয়া ভারী শিল্প-কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে রংপুর টেক্সটাইল মিলস, লরেন্স টেক্সটাইল মিলস্, আরকে মেটাল ইন্ডাস্ট্র্রি, আরভি এডিবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রি, আরভি কয়েল ইন্ডাস্ট্রি, ডিম্পল অটোমেটিক বিস্কুট ফ্যাক্টরি, সিটি অটোমেটিক বিস্কুট ফ্যাক্টরি, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলস্, মায়া পার্টিকেল বোর্ড মিলস্, জালালিয়া মেটাল ওয়ার্কস, তাজ ফাউন্ড্রি, খান ফাউন্ড্রি, ভরসা ফাউন্ড্রি, ডালডা ও সয়াবিন তেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রাহাতিন ইন্ডাস্ট্রি ও ওষুধ কারখানা রংপুর ড্রাগস অ্যান্ড কেমিক্যাল কো-অপারেটিভ সোসাইটি।
জানা যায়, ১০ বছর আগে এখানে চালু হয় মার্কেন্টাইল ব্যাংক রংপুর শাখা। এখন পর্যন্ত এ শাখা থেকে ভারী শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠায় কোনো ঋণ দেওয়া হয়নি। ব্যাংকটির এভিপি আবদুুল মতিন জানান, চার বছর হলো রংপুর এসেছি। এ সময়ে ভারী শিল্প নির্মাণে কোনো উদ্যোক্তাই আসেননি। টাকা নিয়ে বসে আছি। এনসিসি ব্যাংক রংপুরে শাখা খুলেছে ১৬ বছর আগে। এখন পর্যন্ত ভারী শিল্প-কারখানা প্রকল্পে এ ব্যাংকটিও কোন ঋণ দেয়নি। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপক তাহাজ উদ্দিন বলেন, রংপুরে উদ্যোক্তার ঘাটতি আছে। তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে কৃষির পাশাপাশি রংপুরের অর্থনীতিতে শিল্পের ছোঁয়া লাগেনি।
সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আ ফ ম আলী আজগর বলেন, ভারী শিল্প স্থাপনে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার, রংপুরে তা নেই। ভারী শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন গ্যাস। লরেন্স টেক্সটাইল, রংপুর টেক্সটাইল, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিল স্থাপনে বড় অংকের ঋণ দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকও সংকটে পড়েছে। ফলে ভারী শিল্পে ঋণ প্রদান বন্ধ ছিল। তবে স¤প্রতি অনেক যাচাই-বাছাই করে একটি জুট মিল ও একটি ফুড কারখানার জন্য ঋণ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ব্যাংকারদের অভিযোগ সঠিক নয় জানিয়ে রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী বলেন, ব্যাংকগুলোর কাছে শিল্প স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তারা আগেই লোকসানের বিষয়টি বিবেচনা করে। তারা মুনাফার দিকটাই বেশি দেখে।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআই এর সিনিয়র সহ-সভাপতি ও রংপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, স্থানীয় ব্যাংকগুলো শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতা না করে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, বাড়ি নির্মাণ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে মোটা ঋণ প্রদানে বেশি আগ্রহী। তার মতে, এ অঞ্চলে শিল্পায়নে সরকারকে বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের কর ও ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং দ্রæত গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। না হলে শিল্প-কারখানাগুলো যেমন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি নতুন করে কোনো শিল্প-কারখানাও গড়ে উঠবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আনন্দবাজার/শহক









