সেবার চেয়ে পণ্যমুখী অর্থনীতির পরিধি ও জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। আর পণ্য বেচাকেনায় গড়ে ওঠা বাজার জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। অসংখ্য ব্যবসায়ী আর কর্মীদের নিয়েই পণ্য বিপনণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যা সারাবছর জুড়ে পরিচালিত হয়। আর এই বাজারকে কেন্দ্র গড়ে উঠে বিশাল বিজ্ঞাপনী বাজার। পণ্যকে জনপ্রিয়করণের জন্য বিজ্ঞাপন ক্রেতাদের আগ্রহী করে তোলে।
তবে পুরো এই বাজার ব্যবস্থায় যতটা প্রচারণা থাকে পণ্যের গুণগত মান ততবেশি থাকে না অনেক সময়। এতে ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতারিত হন। বিশেষ করে পণ্য কেনার সময় ব্যবসায়ী বা বিক্রয়কর্মীদের সুব্যবহার বা বিরূপ আচরণ ক্রেতাদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তবে অনেক সময় ক্রেতাদের বিশ্বাস আর সরলতার সুযোগ নেন অসাধু অনেক ব্যবসায়ী আর বিক্রয়কর্মী। ক্রেতাদের ঠকিয়ে তারা বেশি মুনাফা লাভের চেষ্টা করেন। এতে ক্রেতাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়।
দেশের অর্থনীতির বিশাল অংশ জুড়েই থাকে নানা উপলক্ষ্য আর উৎসব। যেকোনো উৎসব কিংবা উপলক্ষ্য ঘিরে বেশি সচল হয়ে ওঠে অর্থনীতির চাকা। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি ঈদকে উৎসব ঘিরে পাল্টে যায় জাতীয় অর্থনীতির পুরো চিত্র। দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে, জনে জনে কেনাকাটার ধুম লেগে যায়। আর এই সুযোগে অতি মুনফার প্রবণতা ভয়াবহ আকার নেয়। বেড়েও যায় কয়েকগুণ। যেখানে ক্রেতাসেবার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। দেশ কিংবা জাতীয়তাবোধকে দূরে ঠেলে অনৈকিতভাবে মুনাফা অর্জনের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
ঈদকে ঘিরে সব ব্যবসায়ীই নিজ নিজ দোকান বা স্টল আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে তোলেন। তবে বিপনিবিতানে যতবেশি চাকচিক্ক দেখা যায়, ততবেশি ক্রেতা আকৃষ্ট হন। তবে ব্যবসায়ীদের অনেকেই ঝলমল দোকানে ভালোমানের পোশাক রাখেন না। অভিযোগ রয়েছে, ক্রেতাদের সেবার পরিবর্তে এসব ব্যবসায়ী মুনাফা লাভের দিকে বেশি দৃষ্টি দেন। এমন চিত্রই দেখা গেছে রাজধানীর বিভিন্ন ঈদবাজার ঘুরে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে ৫০০ রুপিতে যে পণ্য পাওয়া যায়, সেটি বাংলাদেশে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়। আবার ক্রেতাসেবার দিকে বেশি মনোযোগ দিলেও নিম্নমানের পোশাক বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে। তবে এসব বিষয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের কোনো পর্যবেক্ষণ কিংবা গবেষণা নেই। তারা বলছেন, উৎসব অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা দরকার। এসব বিষয়ে অফিশিয়াল কোনো তথ্য নেই। কেনার সময় ক্রেতার যদি দেশপ্রেম থাকে তাহলে বিক্রির সময় বিক্রেতারও দেশপ্রেম থাকা প্রয়োজন।
ক্রেতাসেবার আড়ালে ক্রেতাদের ঠকানো শুধু ক্ষুদে বা মাঝারি মানের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এরকম একাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সম্প্রতি পুরাতন প্রাইজ ট্যাগের ওপরে নতুন প্রাইজ ট্যাগ লাগিয়ে প্রতারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। একটির ওপরে তিনবার পর্যন্ত প্রাইজ ট্যাগ লাগিয়ে মূল্যছাড়ের অফার দিয়ে এমন প্রতারণা করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অন্য অনেক দোকানের চেয়ে এসব ব্র্যান্ড কোম্পানির ক্রেতাসেবার মান অনেক ভালো। মাঠ পর্যায়ের তথ্যমতে, ক্রেতাদের ঠকানোর ঘটনায় বেশি অভিযুক্ত হচ্ছে বেশি ক্রেতাসেবা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোই।
রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের পীর ইয়ামেনী মার্কেট। যেটা মধ্যবিত্তদের জন্য পাঞ্জাবির সবচেয়ে বড় মার্কেট। সহস্রাধিক পাঞ্জাবির সংগ্রহ এখানে। এসি-নন এসি দুই ধরনের দোকানই রয়েছে এখানে। বিক্রেতাদের দাবি অনুযায়ী, নন-এসি দোকানের চেয়ে এসি লাগানো দোকানের ক্রেতাসেবা অনেক ভালো। এসব দোকানের পণ্যও নন-এসি দোকানের চেয়ে ভালো। তবে দাম অনেক বেশি।
নরসিংদী থেকে সেখানে কেনাকাটা করতে আসা ফরহাদ আলম নামে একজন দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, এখানে পাঞ্জাবির কালেকশন অনেক বেশি। আমাদের পাঞ্জাবি সেলাইয়ের দোকান থাকায় কাপড় সম্পর্কে আমার মোটামুটি ধারণা আছে। এখানে এসে যা দেখলাম কাপড়ের মানের তুলনায় দাম কয়েকগুণ বেশি। নন-এসির চেয়ে এসি লাগানো দোকানের পোশাক ভালোমানের হলেও দাম কয়েকগুণ। এক থেকে দেড় হাজার টাকার পাঞ্জাবির দাম হাঁকা হয় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অথচ নন-এসি দোকানে একই মানের কাপড়ের দাম চাওয়া হয় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার।
ফরহাদ আলম বলেন, যারা নতুন কেনাকাটা করতে আসেন কিংবা কাপড় সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই তাদের খুব বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তার মতে, এসি-নন এসির মাধ্যমে ক্রেতাসেবার পার্থক্য তৈরি করা হচ্ছে মূলত অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায়।
একই এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা কামাল পাটওয়ারী দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আমি এসি লাগানো দোকান থেকে দুটি পাঞ্জাবি কিনেছি চার হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে। বাসায় গিয়ে দেখি পাঞ্জাবির গায়ে লাগানো স্টিকারে লেখা দেড় হাজার টাকা। অথচ একটির দাম হাঁকা হয়েছিল চার হাজার টাকা। তিনি আরো বলেন, এক দোকানে পায়জামার দাম চাওয়া হয় ৫০০ টাকা। অথচ পাশের দোকান থেকে সেই একই পায়জামা কিনেছি ২৭৫ টাকায়। এভাবে সেবার নামে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, এবার দেশের ঈদবাজারে পুষ্পা শাড়ি, কাঁচাবাদাম লেহেঙ্গা ও থ্রি-পিস, ম্যায় ঝুঁকেগা নেহি লেহেঙ্গা ও থ্রি পিসে সয়লাভ হয়ে গেছে। মূলত এগুলোর আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। শুধু নামের কারণে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে ক্রেতাদের। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক দোকানি যে কোনো পোশাকের নাম ইচ্ছেমতো লিখে দিচ্ছেন। আর ক্রেতারা সেটা বিশ্বাস করে অতিরিক্ত দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানী দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, যখন যে সিনেমা বা নায়ক-নায়িকা আলোচনার শীর্ষে থাকেন তখন তাদের নাম দেয়া হয় বিভিন্ন পোশাকে। আর ক্রেতারাও পাগলের মতো সেসব পোশাক কিনে নিয়ে যান। এতে করে আমাদের অনেক বেশি লাভ হয়। ক্রেতাদের চাহিদার আলোকে আমরা নিজেরাও অনেক সময় নাম লাগিয়ে দেই। সেই বিক্রেতার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যে দোকান যত বেশি সাজানো সে দোকানে ততবেশি ক্রেতা আসেন। সবাই মনে করেন আলোকিত এবং সুসজ্জিত দোকানের পণ্যের মান অন্য দোকানের চেয়ে বেশি ভালো। তাই আমাদের মতো দোকানিরা এখন পণ্যের মানের চেয়ে দোকান সুসজ্জিত করতেই বেশি মনোযোগী হচ্ছি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির মহাসচিব জহিরুল হক ভুঁইয়া দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, ফ্যান লাগানো দোকানের চেয়ে এসি লাগানো দোকানের পণ্যের দাম একটু বেশি হবে সেটা স্বাভাবিক। রাস্তার পাশের দোকানে বানানো চা আর সোনারগাঁও হোটেলের মান এক হলেও দামে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকে। কারণ রাস্তার পাশের দোকানের খরচ আর সোঁনারগা হোটেলের ব্যবস্থাপনা খরচ এক না। সেখানে সার্ভিস চার্জ অনেক বেশি। এ খরচ ভোক্তাদের কাছ থেকেই তুলতে হবে। ভালো সার্ভিস পেতে হলে দাম বেশি তো দিতে হবে। কারণ তারা তো আর খরচ বাড়ি থেকে এনে দিবে না।
এদিকে রাজধানীর অনেক বিপণিবিতানের বিক্রেতারা ক্রেতাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যেখানে দোকানগুলোতে দরদাম না করলে ক্রেতাদের ছেড়ে দেয়া হয় না। অনেক সময় অশালীন আচরণ ও ব্যবহার করা হয়। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ক্রেতাদের। দীর্ঘদিন ধরে এমন কর্মকাণ্ড চললেও তার কোনো সুরাহা হয় না। বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী নেতারাও তেমন গুরুত্ব দেন না বিষয়গুলোতে। গত সোমবার রাত থেকে পরদিন বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর নিউমার্কেটে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।
ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আমরা এখন বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে দেখছি তারা ক্রেতাদের থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে কিনা। কোনো ধরণের প্রতারণার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ঈদের পরে পোশাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। তারা কীভাবে দাম নির্ধারণ করে তা আমাদের এখনো জানা নেই। তাদের কাছ থেকে জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। পোশাকের মান বেঁধে দাম নির্ধারণের বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। ঈদের পরে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।









