মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীনতম বেতশিল্প। বিভিন্ন কারণে দেশি-বিদেশি বাজার হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে শিল্পটি। ফলে এ শিল্পকে ঘিরে যাদের কর্মসংস্থান ও অর্থ আয়ের সুযোগ ছিলো তারা জড়িয়ে পড়েছেন অন্য ব্যবসা বা কাজে। আর যারা টিকে আছেন তাদের নেই সুদিন।
আজ থেকে অর্ধযুগ আগেও বেতের জন্য সুখ্যাতি ছিলো সিলেটের। সিলেটে উৎপাদিত বেতকে ঘিরে এ অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিকাশ লাভ করে বেতের ফার্নিচার শিল্প। এখানকার বেতের ফার্নিচারের কদর দেশেরগণ্ডি বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। রফতানিও হতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে বর্তমানে দেশে কাঁচামাল সঙ্কট, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিকমজুরি বৃদ্ধিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে বেতের ফার্নিচারের বাজার। রফতানি বন্ধের পাশাপাশি হারাচ্ছে দেশীয় বাজারও। এ অবস্থায় ধুঁকছে সিলেটের বেতের ফার্নিচার নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে পড়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
রফতানিকারকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সিলেটে তৈরি বেতের ফার্নিচারের ডিজাইন ও কাজ ভালো হওয়ায় ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তবে আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন ফার্নিচার উচ্চদামে বিক্রি করতে হয়। সিলেটে তৈরি ফার্নিচারের চাইতে অনেক কম দামে ইন্দোনেশিয়া ও চীনে বেতের ফার্নিচার পাওয়া যায়। ফলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এর বাজার দখল করে নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও চীন।
এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সম্ভাবনাময় বেতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সংকট দূর করা গেলে ঘুরে দাঁড়াবে বেতশিল্প। ফের ইউরোপ ও আমেরিকায় রফতানি করা যাবে বলে জানান তারা।

বেতের আসবাবপত্র তৈরির জন্য সিলেট নগরীর ঘাসিটুলায় রয়েছে ‘বেতপল্লী’। একযুগ আগেও দেশের বেত দিয়ে নির্মিত পণ্যের বেশিরভাগই উৎপাদিত হতো এ পল্লী থেকে। তবে বর্তমানে এখানকার অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে গেছে। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন বেতের কারিগররা। ঘাসিটুলায় বছর দশকে আগেও অর্ধশতাধিক বেতের ফার্নিচারের দোকান থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে ২০ থেকে ২২টিতে। ঐতিহ্যেরটানে যারা এ শিল্পকে ছাড়তে পারছেন না তারা পড়েছেন দুর্দিনে। এছাড়া সিলেটের বালাগঞ্জ, মৌলভীবাজারের চুনারুঘাট ও সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে আরো পাঁচ সহস্রাধিক শ্রমিক বেতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাদেরও নেই সুদিন।
জানা যায়, দীর্ঘকাল থেকে সিলেটের বেতের তৈরি আসবাবপত্র দেশীয় বাজারে বিক্রি হয়ে আসলেও দেশের বাইরে রফতানি শুরু হয় এ শতাব্দির শুরুরদিকে। মানাউ রাতান ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এবি কেইন রাতান ফার্নিচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের তৈরিকৃত পণ্য রফতানি শুরু করে। মূলত কানাডা, আমেরিকা ও ইল্যান্ডে রফতানি হতো সিলেটের বেতের ফার্নিচারগুলো। তবে দেশে বেতের সংকট ও আমাদানিকৃত বেতের দাম বেড়ে যাওয়ায় বছরপাঁচেক ধরে বন্ধ রয়েছে রফতানি।
রফতানিকারকরা দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সিলেটে উৎপাদিত বেতের মান ছিলো সবচেয়ে ভালো। তবে এখন সিলেটে বেতবন কমে আসা ও পোক্ত হওয়ার আগেই বেত কেটে ফেলার কারণে সিলেটের বেত দিয়ে এখন আর ভালোমানের ফার্নিচার তৈরি করা সম্ভব হয় না। তাই মায়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বেত আমদানি করতে হয়। এ দুই দেশ থেকে আমদানিকৃত বেত দিয়ে ফার্নিচার তৈরি করে রফতানি করা হতো। তবে গত কয়েক বছরে আমদানিকৃত বেতের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে।
বেতের ফার্নিচার নির্মাণকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ইন্দোনেশিয়া থেকে সাত বছর আগেও প্রতি কেজি বেত আমদানিতে খরচ পড়তো সাড়ে ৩ থেকে ৪শ’ টাকা। এখন প্রতিকেজি বেত আমদানি করতে হয় ১২ থেকে ১৫শ’ টাকায়। বেতের দাম তিনগুণের চেয়ে বেশি বেড়ে যাওয়ায় বেড়ে গেছে উৎপাদন খরচ। ফলে বিক্রিও করতে হয় অতিরিক্ত দামে। এ অতিরিক্ত দামে বিদেশি ক্রেতারা ফার্নিচার কিনতে আগ্রহী না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে রফতানি।
খাদিমনগর বিসিকে প্রাতষ্ঠিত বেতের ফার্নিচার নির্মাণ ও রফতানিকারি প্রতিষ্ঠান মানাউ রাতান ফার্নিচার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক শাহ আলম জানান, ২০০৫ সাল থেকে তারা ফার্নিচার নির্মাণ ও রফতানি শুরু করে। বছরে তারা দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ফার্নিচার রফতানি করতেন বলে জানান তিনি।
শাহ আলম বলেন, বর্তমানে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় রফতানি বন্ধ রয়েছে। এমনকি দেশীয় বাজারেও বেচাকেনা কমে গেছে। তিনি বলেন, আগে মাসে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার ফার্নিচার বিক্রি হতো। এখন ৭ থেকে ৮ লাখ টাকারও বিক্রি হয় না।
শাহ আলম বলেন, সিলেটে পরিকল্পিতভাবে বেত চাষ, বেত আমদানিতে শুল্ক হ্রাস ও কৃষিনির্ভর কুঠিরশিল্প হিসেবে বেতশিল্প থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে আবার চাঙা হয়ে ওঠবে এ শিল্প। রফতানি করাও সম্ভব হবে। ইউরোপ ও আমেরিকায় সিলেটের বেতের তৈরি ফার্নিচারের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক








