বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী রেশমের ইতিহাস বহু প্রাচীন। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের বর্ণনায় পাওয়া যায় রেশমের পেছনের চমকপ্রদ এক কাহিনি। ঘটনাটি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০-২৬০০ অব্দের। চীনের তৎকালীন সম্রাট হোয়াঁতির রাণী লেইৎসু একদিন বাগানের একটি গাছের নিচে বসে চা পান করছিলেন। এ সময় রাণীর চায়ের কাপে গাছ থেকে একটি রেশম পোকা পড়ে। প্রথমে লেইৎসু ভীষণ বিরক্ত হন। তবে রেশমের গুটির আকার-আকৃতি দেখে অবাক হলেন। এরপর নিজ হাতে রাণী চায়ের কাপ থেকে রেশম গুটি উঠিয়ে নেন। তখন রাণী অবাক হয়ে দেখলেন গলে যাওয়া রেশম গুটির মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে সোনালি রঙের চমৎকার চকচকে সুতা। ধারণা করা হয় রেশম বা সিল্কের সুতো বা ফাইবার আবিষ্কারের শুরুটা এখান থেকেই। তারপর থেকে রাণী লেইৎসু খেতাব পান ‘সুতোর রাণী’ হিসেবে। ঘটনাটিকে অনেকেই অনেকভাবে বর্ণনা করেছেন। অনেকেই সত্য বলে ধরে নেয়, কারো কারো কাছে সেটা মিথ্যা কাহিনি।
তবে কাহিনিটি সত্য বা মিথ্যা যাই হোক না কেন, চীন থেকেই মূলত সমগ্র পূর্ব-পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে তুঁত বা রেশমের বাণিজ্যের বিস্তার ঘটতে থাকে। আর যে পথে এই বাণিজ্য হতো ঐতিহাসিকভাবে সেই পথের নাম রেশম পথ বা সিল্ক রুট বা সিল্ক রোড। যে রুটের মাধ্যমে চীনের বেইজিং থেকে ভূমধ্যসাগরের উপকূল হয়ে প্রথমে গ্রিস ও পরে রোমান সাম্রাজ্যে রেশমের বাণিজ্যিক প্রসার ঘটে। পরে দক্ষিণে ইয়েমেন, বার্মা ও ভারতবর্ষে বিস্তৃতি লাভ করে। ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম তিব্বত থেকে হিমালয়ের পাদদেশে রেশম চাষের বিস্তার ঘটে।
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে মোঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় রেশমশিল্পের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা এবং ভারতের মালদা ও মুর্শিদাবাদ বেঙ্গল সিল্কের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পায়। ঐতিহ্যবাহী সেই রেশমই কালে কালে রাজশাহীর প্রধান পরিচয় হয়ে উঠে। রাজশাহীর অপর নাম ‘সিল্কসিটি’ হয়ে ওঠে। তবে আধুনিকতার ঢেউয়ে সিল্ক সিটির ইতিহাস-ঐতিহ্য আজ অনেকটাই ম্লান।
নানা জটিলতার কারণে আজ থেকে দুই দশক আগে ২০০২ সালে তৎকালীন জোট সরকার বন্ধ করে দেয় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম কারখানা। সেই থেকে টানা ১৬ বছর বন্ধ থাকে কারখানা। দীর্ঘ এই সময়ে নানা পরিকল্পনা করা হলেও আর সচল করা সম্ভব হয়নি রেশম কারখানা। ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে রেশম কারখানা চালুর করা দাবি আর পরিকল্পনাগুলো। তবে ২০১৮ সালে এসে আবারো চালু হয় কারখানা।
রাজশাহীতে ঐতিহ্যের কারণে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও মেলে রেশমের। এরপর রেশমের সুদিন ফেরাতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় ১৫৩ কোটি টাকার ৪টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এতে নতুন করে আশার মুখ দেখছে এই শিল্প। বর্তমানে রেশম কাপড়ের চাহিদাও বেড়েছে বহুগুণ। এ অঞ্চলের চাষিদের উৎপাদিত রেশম গুটি থেকে কারখানার সামনের রেশম প্রদর্শনীতে মিলছে রেশম পণ্য। এর মধ্যে থাকছে প্রিন্টেড শাড়ি, টু-পিস, থান কাপড়, ওড়না, স্কার্ফ, টাই ইত্যাদি।
জানতে চাইলে রেশম বোর্ডের প্রধান উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বিভাগের কর্মকর্তা জেরিন মৌসুমী কান্তা আনন্দবাজারকে বলেন, ২০১৮ সালে কারখানা চালুর পর থেকে সাড়ে ২৩ হাজার মিটারের বেশি কাপড় উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে আভ্যন্তরীণ সুতার চাহিদা ৩০০ টন। চলমান চারটি প্রকল্প থেকে আরও ৪১ টন রেশম গুটি উৎপাদন সম্ভব হবে। এ পর্যন্ত গুটি উৎপাদন হয়েছে ১৬ দশমিক ৭৯ লাখ কেজি। তা থেকে রেশম সুতা তৈরি হয়েছে ১২ হাজার ২১১ কেজি।
রেশম বোর্ড সূত্রমতে, রাজশাহী রেশম কারখানায় প্রায় ৪১ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কাজ করছে। এখানে চায়না ও কোরিয়া থেকে ষাটের দশকে কেনা ৪৩টি তাঁত মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মেশিন পুণরায় সচল করে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ গজ কাপড় উৎপাদন হচ্ছে। মাসে হিসেবে ১২০০ থেকে ১৩০০ গজ কাপড় উৎপাদন হয়। ২০১৮ সালে কারখানা চালুর পর থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হয়েছে। রেশমজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক বিক্রয়ের ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী ও গাজীপুরে রেশম পণ্যের দুটি শো-রুম রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক জিআই সনদ প্রাপ্তির পর রেশম কাপড়ের চাহিদা বেশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ড. এম. এ মান্নান আনন্দবাজারকে বলেন, রেশমের পুরনো ঐতিহ্য, গুণগত মান ও জনপ্রিয়তার কারণে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে রেশম কাপড়ের চাহিদা রয়েছে। অভিজাতদের প্রথম পছন্দ রেশমজাত পণ্য। লক্ষ্য রয়েছে পুণরায় রেশম শিল্পের সুদিনে ফেরার।
ড. এম. এ মান্নান আরো বলেন, রেশমশিল্পের হারানো ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বর্তমানে গবেষণা কার্যক্রমসহ রেশম সম্প্রসারণে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহীসহ সারাদেশে ৪টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রেশম চাষ সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে পার্বত্য জেলাসমূহে আদিবাসী ও আদিবাসী নয় এমন হতদরিদ্র ১০ হাজার ব্যক্তির কর্মসংস্থান অন্যতম।









