বেশ কিছুদিন ধরে দেশে আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরণের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে, গত অর্থবছরের তুলনায় আমদানি ব্যয় প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার কথা বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রপ্তানি আয় দিয়ে আর ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতি মাসে ঘাটতি হচ্ছে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে আছে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ। এসব সংকটে বাড়ছে ডলারের দাম। আর চাহিদা মেটাতে গিয়ে কমছে রিজার্ভ। ফলে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডলারের ঘাটতির ধাক্কা সামাল দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীল রাখতে, সাময়িকভাবে হলেও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বন্ধ রাখার কথা বলা হচ্ছিল।
এমতাবস্থায় আমদানি প্রবণতা কমাতে ও দেশীয় পণ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদেশি ফুল ও ফল, ফার্নিচার এবং কসমেটিকস আইটেমের দুই শতাধিক পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ মূলক শুল্ক (আরডি) আরোপ বা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমদানিকৃত ফল, কসমেটিকস, ফার্নিচার ও ফুলের ওপর ২০ শতাংশ হারে রেগুলেটরি ডিউটি বা নিয়ন্ত্রকমূলক শুল্ক আরোপ করেছে সরকার। এতে এ ধরণের শতাধিক আইটেমের আমদানিতে বাড়তি শুল্ক দিতে গিয়ে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত সোমবার রাতে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে ফার্নিচার ও কসমেটিকস জাতীয় প্রায় ১৩৫টি এইচএস কোডভুক্ত পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান ৩ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিলাসবহুল গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানিতে ৭০ শতাংশ নগদ জমার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ সফর বন্ধ করেছিল সরকার।
বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের ফল আমদানিতে ৫৮ শতাংশ থেকে প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কর রয়েছে। যার মধ্যে ৩ ভাগ আরডি রয়েছে। নতুন করে এসব ফলের উপর ২০ ভাগ আরডি আরোপ হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস আইটেমে ১০৪ ভাগ থেকে ১২৭ ভাগ পর্যন্ত শুল্ক-কর রয়েছে। আর ফুল আমদানিতে রয়েছে ৫৮ ভাগ শুল্ক-কর।
বাংলাদেশ মূলত বিভিন্ন ধরনের কমলা, আপেল, আঙ্গুর, খেজুর, মাল্টা বেশি আমদানি হয়। এর বাইরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন নতুন ফল আমদানি হচ্ছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূলত এসব পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্যাট আইন বিশেষজ্ঞ এবং চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ফার্ম, স্নেহাশিস মাহমুদ এন্ড কোম্পানির সহযোগী স্নেহাশিস বড়ুয়া বলেন, ‘সরকার বিদ্যমান ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে এসব পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং অ্যান্ড প্লান্ট কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দুই লাখ টনের বেশি আপেল, দেড় থেকে দুই লাখ টন কমলা এবং ৫০ হাজার টনের বেশি আঙ্গুর আমদানি হয়। তবে মাল্টা আমদানির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে নি। ২০২০ সালে বাংলাদেশে স্কিনকেয়ার প্রডাক্টের বাজার ছিল ১.১৬ বিলিয়ন ডলারের; ২০২৭ সাল নাগাদ এ বাজার ২.১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এতে ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে সামগ্রিকভাবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮.১ শতাংশ। বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, প্রসাধন সামগ্রীর ৮০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়।
এদিকে, বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে তিন হাজার ৪০৮টি পণ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা আরডি প্রযোজ্য রয়েছে। এসব পণ্যে সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত আরডি প্রযোজ্য রয়েছে। এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল আইটেম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ আইটেমগুলোর ওপর উচ্চ শুল্ক রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার উচ্চ ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা অনুসরণ করে নতুন করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলমান বিশ্বমন্দা পরিস্থিতি সামাল দিতে ও সংকট উত্তরণে সম্প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ বা বৃদ্ধি করা পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- তাজা ও শুকনো যেকোনো ধরনের আমদানি করা ফুল, অলংকার তৈরিতে আমদানি করা ফুল, বিভিন্ন ধরনের আর্টিফিশিয়াল ফুল এবং গাছের চারা কিংবা গাছের শাখা-প্রশাখা। ফলের মধ্যে রয়েছে- তাজা বা প্রক্রিয়াজাত আম, কলা, আঙ্গুর, ডুমুর, আনারস, অ্যাভোকাডো, পেয়ারা, ম্যাঙ্গোস্টিন বা গাব জাতীয় ফল, লেবু, তরমুজ, বরই, এপ্রিকট, চেরি জাতীয় ফল, হিমায়িত কিংবা প্রক্রিয়াজাত করা ফল বা ফলের বীজ ও মিক্সড ফলের খাবার।
ফার্নিচারের জন্য আমদানি করা বাঁশ, পার্টস, বেতের ফার্নিচার এবং ফার্নিচারের জন্য আমদানি করা বিভিন্ন উপাদান। এছাড়া অফিস, রান্নাঘর, বেডরুমে ব্যবহৃত কাঠের ফার্নিচার, প্লাস্টিকের ফার্নিচার ও বিভিন্ন মেটাল ফার্নিচার। কসমেটিকসের মধ্যে পারফিউম, বিউটি ও মেকআপ প্রিপারেশন, দাঁতের ফ্লস, দাঁতের পাউডার, প্রিশেভ ও আফটার শেভ কসমেটিকস, চুলের জন্য প্রসাধনী ইত্যাদি।
এর আগে ডলার–সংকট সামাল দিতে গাড়ি, মুঠোফোন, সিগারেটসহ ৩৮ পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে পাকিস্তান। দেশটিতে ডলারের বিনিময় মূল্য এরই মধ্যে ২০০ রুপি ছাড়িয়েছে। এ কারণে সংকট সামাল দিতে বিলাসপণ্য আমদানি নিষিদ্ধের পথ বেছে নিয়েছিল পাকিস্তান।
আনন্দবাজার/শহক









