- ১৬ জেলায় জেগেছে ১৩২৬ চর
- সবুজে ভরে উঠছে ধু-ধু বালুচর
- বদলে যাচ্ছে উত্তরের গ্রামীণ অর্থনীতি
মঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার দুর্নাম ঘুচিয়ে গেল কয়েক দশক ধরেই কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে চমক দেখিয়ে চলেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো। নিজ নিজ উদ্যোগে তারা বদলে দিচ্ছেন গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। ঘরে ঘরে স্বাবলম্বী নারীদের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ আর বাড়তি আয়ের সহজলভ্যতার কারণে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধকল সামলানো কৃষকরাও ধীরে ধীরে শক্ত ভিতের ওপর নিজেদের দাঁড় করাতে চেষ্টা করছেন। দশকের পর দশক ধরে বন্যা আর খরার সঙ্গে যুদ্ধ করে চলা উত্তরের নদীপাড়ের কৃষকদের থাকতে হয় কোনো কোনো শঙ্কায়। দফায় দফায় ধাক্কা খেতে হয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে।
চলতি বছরেও কয়েক দফার বন্যা হানা দিয়েছে উত্তরের নদীপাড়ের জেলাগুলোতে। এতে কৃষকের আশায় গুড়ে বালি পড়েছে। সর্বশেষ গেল অক্টোবরের আকস্মিক বন্যায় উত্তরের তিস্তা, ধরলা, সানিয়াযান, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের দেড় ডজন উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নদীভাঙনের কারণে বালুচাপা পড়ে উঠতি ফসল। একই সঙ্গে ভাঙনের তোড়ে নদীতে বিলীন হয় বহু আবাদি জমি। এতে বিবর্ণ হয়ে যায় কৃষকের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে আবারো জাগিয়ে দেয়ার জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নামেন কৃষক। প্রাণপণ চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলে। লাখ লাখ কৃষকের কষ্টের মধ্যে ফুটে উঠছে হাসি।
সূত্রমতে, দেশের উত্তর জনপদের ১৬ জেলার নদী অববাহিকায় বর্তমানে জেগে উঠেছে এক হাজার ৩২৬টি চর। এসব চরে আবারো ফসলের স্বপ্ন দেখছেন লাখ লাখ কৃষক। বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়া কৃষকরা জেগে ওঠা চরের দিকে তাকিয়ে আবারো আগামীর স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। চলতি অগ্রহায়নেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে উত্তরের নদীগুলো। এসব মরা নদীর বুকে একের পর এক জেগে উঠে ধু-ধু বালুচর আবার সবুজের হাতছানি দিতে শুরু করেছে। কৃষকরা ধু-ধু বালুচরে ফসল বুনতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে সবুজ হচ্ছে দিগন্ত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। কপালে চিন্তার খানিকটা ভাঁজ থাকলেও বন্যা আর খরার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দুর্বার হয়ে উঠেছেন প্রান্তিক কৃষকরা। নতুন উদ্যোমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় মুখর কৃষকদের সময় কাটছে ব্যস্ততায়।
চলতি মৌসুমে উত্তরের নদীবেষ্টিত ১৮ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক লাখ ৭৩ হাজার কৃষককে সরকার প্রণোদনার আওতায় এনেছে। এসব বন্যায় দুই লাখ ৯৯৫ হেক্টর জমির রোপা আমন, সাত হাজার হেক্টর জমির কাঁচামরিচ, আট হাজার হেক্টর জমির চীনা বাদাম নিমজ্জিত হয়। এতে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় ৬৩ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ফসল। সরেজমিনে লালমনিরহাটের আদিতমারি উপজেলার চর গোবর্ধন, বালাপাড়া, কুটিরপাড় এবং হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারি, সিন্দুনা, সানিয়াযান চরসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেখা গেছে, তিস্তার আকস্মিক বন্যার পর পানি নেমে গিয়ে ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আশপাশে এখনো পড়ে আছে বিধ্বস্ত বাড়িঘর। তিস্তার বালুতে চাপা পড়ে আছে কৃষকের ফসলি খেত। কাঁচি ও কোদাল দিয়ে সেই বালু সরানোর চেষ্টা করছেন তারা। পানি সরে যাওয়ার পর কিছু ফসলে পচন দেখা দিয়েছে। আবার কোথাও কোথাও শীতকালীন সবজির খেতসহ মিষ্টিকুমড়া, আগাম আলুসহ নতুন ফসল রোপন করেছে চাষীরা।
কৃষকরা বলছেন, বালুচর এখন তাদের জন্য আশীর্বাদ। এসব চরের বালিতেই ফলবে সোনার ফসল। ঘুরে যাবে করোনা মহামারি আর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভাগ্যের চাকা। সবজিখেত পরিচর্যায় ব্যস্ত আসমা বেগম বলেন, চরের মধ্যে আলু, কুমড়া, ভুট্টা লাগাছি। আলু তোলার পর বাদাম লাগামো। পানি না থাকাতে কষ্ট আছে। কিন্তু বালুতে কোনো রকমে চাষাবাদ শুরু করা লাগে। তাছাড়া হামার মতো গরিবের আর কোনো উপায় নাই।
উত্তরের কৃষকরা বলছেন, অসময়ে তিস্তার আকস্মিক বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেশি। তাদের ধান, আলু, সবজি, বাদামসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দেনায় পড়েছেন। তারপরেও আবার নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। চর ভোটমারির কৃষক আক্কাস মিয়া বলেন, ভালো বীজ পাওয়া যায় না। এ্যালা বীজের সমস্যা। তারপরও মিষ্টিকুমড়া লাগাইছি দুই একর মাটিত। সারের দাম বাড়ছে। বস্তাতে দেড়-দুইশ টাকা বেশি লাগে। সরকার যদি নজর দেয় হামারগুল্যার আবাদ সুবাদ করতে সুবিধা হইবে। চরের বুকোত এ্যালা যত আবাদ দেখোছেন, সোগে অভাবী মানুষেরা করছে। এই আবাদের ফসল ব্যাচে হামাক সংসার চলা লাগবে।
নদীর চরে পানি না থাকায় এখন ধান কাটায় ব্যস্ত গড্ডিমারি ইউনিয়নের চর গড্ডিমারি গ্রামের ওমর আলী। হাঁটতে হাঁটতে ধানের জমির দিকে চেয়ে তার চোখ বেয়ে পানি ঝরছিল। তার বিস্তীর্ণ ধানের জমি কাদা, বালু আর পলিতে চাপা পড়েছে। যেন কোমল ধানের শীষগুলোয় চাপা না পড়ে ওমর আলীর বুকেই চেপে বসে আছে। এই চাষি বলেন, এবার বানোত হামার মেলা সর্বনাশ হইছে। এরকম ভয়ংকর পরিস্থিতি ইয়ার আগোত কোনো বারে হয় নাই। বালু সারেয়া ধানা কাটা শ্যাষ করি নতুন ফলস নাগামো। প্রতিবছর হামরা কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওছি। সরকার হামার তিস্তা নদীর শাসন না করিলে এই রকম ক্ষতি হইতে থাকপে।
একই ইউনিয়নের বাঁধেরপাড় গ্রামের কৃষক ঝনটু বলেন, হামার আবাদি জমি সোগ তলে গেচলো। আলু, শাকসবজি, কুমড়ার খেত পঁচি গেইছে। অসময়ে বানোত হামার মেলা ক্ষতি হইলে কিন্তু কায়ো হামার পাকে তাকায় না। কৃষি অফিস থাকি নাম লেখি নিয়্যা গেইছে। সদর উপজেলার রাজপুর চরের কৃষক হযরত আলী জানান, বাজারে আগাম মরিচ বিক্রি করে লাভের আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু তিস্তার আকস্মিক বন্যায় তার সেই আশা শেষ হয়ে গেছে। হতাশ হযরত আলী আবার নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
গত ২০ অক্টোবর উজানের ঢলে তিস্তা অববাহিকায় বিপৎসীমার এযাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙে ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল। পানির স্রোতে তিস্তা-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা। এতে ধান, আগাম আলু, মরিচ ও চীনা বাদাম, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। চারদিনের মাথায় ফুলে ফেঁপে ওঠা তিস্তার বুক থেকে পানি নেমে যায়। এরপরই জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ চর। শীত মৌসুম ঘিরে এসব চরে ফসলের স্বপ্ন বুনছেন চাষীরা। ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে চরাঞ্চল।
উত্তরের চাষীদের ঘুরে দাঁড়াতে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা নানা পরামর্শ দিচ্ছেন চাষীদের। এ ব্যাপারে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ আনন্দবাজারকে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার চরাঞ্চলে ফসলের আবাদ ভালো হয়েছিল। আকস্মিক বন্যায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাধারণত এ সময় বন্যা হয় না। তবে এখন কৃষকরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন। তাদের কৃষি অধিদফতর থেকে নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইকবাল আনন্দবাজারকে বলেন, রবি মৌসুমে ছয়টি ফসলের যে কোনো একটির জন্য এক লাখ ৭৩ হাজার কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ কৃষক এই প্রণোদনার আওতায় আসবে। এতে কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন ফসলের সার ও বীজ সহায়তা দেওয়া হবে।
আনন্দবাজার/শহক









