মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। সেই চাহিদা পূরণ করতে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি সারাদেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রাইভেট ক্লিনিক (বেসরকারি হাসপাতাল) ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এরমধ্যে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ৩২৮টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। জেলা ১২৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলছে শুধু নামমাত্র আবেদন দিয়ে।
বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৮৬টি এবং আবেদনকৃত ৫৭টি। তবে এ পরিসংখ্যানের বাইরেও ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। শুধু শহরেই নিবন্ধিত ও আবেদনকৃত ক্লিনিক- ডায়াগনস্টিকের সংখ্যা কমপক্ষে ৭০টি। সদর হাসপাতালের সন্নিকটেও রয়েছে বেশ কটি প্রাইভেট ক্লিনিক। কিছু ক্লিনিকের সেবার মান ঠিক থাকলেও বেশিরভাগ ক্লিনিকের চিকিৎসা সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই চলছে জেলার বৃহৎ সংখ্যক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক ক্লিনিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ প্যাথলজিস্ট ও সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে অধিকাংশ ক্লিনিকেই অদক্ষ প্যাথলজিস্ট দিয়ে চলছে পরীক্ষা নিরিক্ষার কাজ। ফলে প্রতিনিয়ত প্রতারণাসহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন রোগীরা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাতারাতি গড়ে উঠছে নতুন নতুন ক্লিনিক।
এদিকে বেশকিছু ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। মির্জাপুরের দেওয়ান হাসপাতালে সাজিদ হোসেন, সখীপুরের মডার্ন ডক্টরস হাসপাতালে এক প্রসূতি, লাইফ কেয়ার হাসপাতালে সৌরভ আহমেদ, ফাতেমা মডার্ন হাসপাতালে স্বর্ণা আক্তার ও নুরুল আমীন খান মাল্টিপারপাস মেডিক্যাল সেন্টারে রিনা বেগম নামের রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে হামলাও চালিয়েছিল।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষা-নিরিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক ক্লিনিকের চিকিৎসক পরীক্ষার সঠিক ফল পেতে রোগীকে পরীক্ষার জন্য অন্য ক্লিনিকেও পাঠিয়ে থাকেন। বর্তমানে বেশকিছু ক্লিনিকের চিকিৎসক তার নিজের ক্লিনিকের ওপর ভরসা না করে শহরের মেডিনোভাতে পরীক্ষার জন্য রোগী পাঠিয়ে থাকেন। স্থানীয় সংবাদকর্মীসহ একাধিক রোগীর অভিযোগ, মেডিনোভা মেডিক্যাল সার্ভিসের রিপোর্টও অনেকসময় প্রশ্নবিদ্ধ।
অনুমোদনহীন এসব নিম্নমানের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের ভ্রাম্যমাণ আদালতের যৌথ অভিযান কম থাকায় মান-উন্নয়নে কাজ করছেন না ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে সাধারণ মানুষ এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এসে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরেজমিন ঘুরে ক্লিনিকের বিষয়ে রোগীরা দিয়েছেন নানা অভিযোগ। অনুসন্ধানেও মিলেছে তার অনেক প্রমাণ।
অধিকাংশ ক্লিনিকে অনভিজ্ঞ প্যাথলজিস্ট দিয়ে চলছে পরীক্ষা নিরীক্ষা। ছোট-ছোট ক্লিনিকে মালিক নিজেই সব ধরনের পরীক্ষা নিরিক্ষা করছে। যার ফলে সঠিক রোগ নির্নয় করতে পারছে না চিকিৎসক। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে বাসন্তি সরকার নামের এক রোগী যান সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসক রোগীকে এ্যাবন্ডিক্সের অপারেশন করতে যান অপারেশন থিয়েটারে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর চিকিৎসক বলেন, তার অ্যাপেন্ডিক্স রোগ হয়নি। পরে তড়িঘড়ি সেলাই করে রোগিকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
অধিকাংশ ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারে নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি। কোনো কোনো সার্জারি ডাক্তার নিজে বহন করে আনেন তার নিজস্ব যন্ত্রপাতি। কোথাও কোথাও অক্সিজেন সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে অপারেশনের রোগীরা। অপারেশনের রোগীকে কিছুক্ষণ নিবিড় পরিচর্যায় (আইসিইউ) নেয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিকে অপারেশনের পরই জ্ঞান আসার আগেই রোগীকে তার বিছানায় স্থানান্তর করা হয়। আইসিইউ ব্যবস্থা না থাকায় জটিল অপরেশনের রোগীরা থাকে চরম ঝুঁকিতে।
ক্লিনিকের সামনে বড় করে লেখা থাকে দিবা-রাত্রী ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়া হয়। অথচ রাত ৮টার পর অধিকাংশ ক্লিনিকে সেবা দেয়ার মতো কোনো চিকিৎসক থাকেন না। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার সারাদিন রাজধানী থেকে আসা চিকিৎসক থাকলেও সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে চিকিৎসক থাকেন বিকেল তিনটার পর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। অথচ প্রচার করা হচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা সেবা। অপারেশনের রোগীদেরও সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য নেই কোনো চিকিৎসক। রাতে ভিজিটিং আওয়ার ছাড়া চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম নেই।
এদিকে বেশিরভাগ ক্লিনিকে বড় করে জরুরি বিভাগ লেখা থাকলেও নেই কোন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক। জরুরি বিভাগ থাকলেও জরুরি রোগীকে অপেক্ষা করতে হয় নির্ধারিত চিকিৎসকের জন্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি থাকা জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দিলেও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ভিন্ন চিত্র। ক্লিনিকেই ভর্তি রেখে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করানোর অভিযোগ অহরহ।
অপরদিকে, অধিকাংশ ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ দালাল চক্রের সঙ্গে আঁতাত করে রোগীকে ক্লিনিকমুখী করার চেষ্টা করে লাভবান হচ্ছে ক্লিনিক কর্র্তৃপক্ষ ও দালাল চক্র উভয়েই। এতে মোটা শতাংশের পিসি নিচ্ছে দালাল চক্র। একটি পরীক্ষার শতকরা ৭০ শতাংশই পিসি হসেবে চলে যাচ্ছে চিকিৎসক আর দালালদের পকেটে। ফলে চিকিৎসা করতে হিমসিম খেতে হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের রোগীদের।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক তরুণ ইউসুফ বলেন, টাঙ্গাইলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকে নিখাদ সেবার মান নিয়ে আমরা অসন্তুষ্ট। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীরা প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্থ হন। মোটা অঙ্কের টেস্ট ধরিয়ে দেয়, তারপর ব্যবস্থাপত্র। একেক জায়গায় একেক রকম টেস্ট রেট, কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের তাতে খেয়াল নেই।’
জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি লায়ন এম শিবলী সাদিক বলেন, আমরা জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতি কর্তৃক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করিয়েছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি ক্লিনিক সিলগালা করিয়েছিলাম। কোনো ফাঁকফোকের কাগজ প্রস্তুত করে পুণরায় ক্লিনিক চালু করেছে।
জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনম বজলুর রহিম রিপন বলেন, জেলার দুশর বেশি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আমদের সমিতির আওতাভুক্ত রয়েছে। সমিতির অধীনে ১৩৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ১০৫টি হাসপাতাল রয়েছে। অনুমোদিত ক্লিনিক আমাদেও সমিতিতে নেই। তবে যেসব ক্লিনিক এখনও অনুমোদিত তাদেও অধিকাংশই আবেদন করে রেখেছে। বিভাগীয় কাজের চাপে অনুমোদন পেতে দেরি হচ্ছে। এছাড়া যেসব ক্লিনিকে মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে আমরা সমিতির পক্ষ থেকে তদারকি করেও তাদের মান নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে রোগীদেরও সচেতন হতে হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তদারকির দায়িত্বে থাকা সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘অনেকেই সরকারি শর্তাবলি মানে না। নিবন্ধন না করেই চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করে দেয়।’
টাঙ্গাইল জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. সাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘বহু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেবার মান যতটুকু দরকার, ততটুকু নেই। অনিবন্ধিত ক্লিনিকগুলো নিবন্ধন করতে উদ্বুদ্ধ করছি। যাদের সেবা নিম্নমানের তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করার চেষ্টা করছি।
আনন্দবাজার/শহক









