স্বাস্থ্যখাতের ব্যয়কে বিনিয়োগ চিন্তা করে জনস্বাস্থ্যে বাজেট বাড়াতে হবে। কেননা দেশের নাগরিকরা সুস্থ না থাকলে অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বরাদ্দকৃত বাজেট ব্যয় না করে ফেরত দেয়া। অথচ মানুষ সঠিক চিকিৎসার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে বরাদ্দকৃত বাজেট যথাযথ কাজে ব্যয় করতে হবে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে।
গতকাল সোমবার ‘স্বাস্থ্য বাজেট বিষয়ক প্রাক-বাজেট জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ এবং উন্নয়ন সমন্বয় বাংলাদেশ। রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। এতে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ারের চেয়ারম্যান ও উন্নয়ন সমন্বয় বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান।
বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ বাজেট থিমেটিক গ্রুপের সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হকের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ, ডা. হাবিব এ মিল্লাত, রুমিন ফারহানা, ব্র্যাকের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক ডা. মোরশেদা চৌধুরী, ইউএনডিপির প্রতিনিধি ডা. দেওয়ান এমদাদ হোসেন, শামীম হায়দার পাটোয়ারি, ডা. জাকির হোসেন, সুইডেন দূতাবাসের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিনিধি ডা. জহির হোসেন, প্রথম আলোর জেষ্ঠ প্রতিবেদক শিশির মোড়ল।
ড. আতিউর রহমান বলেন, চলতি বাজেটে আগের বাজেটগুলোর তুলনায় স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বেড়েছে। তবে এটি যথেষ্ট নয়। কেননা দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের মোট ৬৮ শতাংশই নিজের পকেট থেকে করতে হচ্ছে নাগরিকদের। সরকার দেয় মাত্র ২৩ শতাংশ ও অন্যান্যখাত থেকে ৯ শতাংশ আসে। বর্তমান স্বাস্থ্যখাতে বাজেট হচ্ছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এটি ২৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৪০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা করা হলে বাজেটের ৭ শতাংশ হতো।
সাবেক গভর্নর উন্নয়ন সমন্বয় এর ২০২২ সালের দেশের ৮টি জেলার উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স-ইউএইচসি, ইউনিয়ন হেলথ সাব-সেন্টার-ইউএইচএসসি এবং কমিউনিটি ক্লিনিক-সিসির সেবাদানকারী ও সেবাপ্রার্থিদের ওপর জরিপের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ২০২১-২২ সালে ইউএইচসির ৪২৯টি কেন্দ্রের জন্য বাজেট ছিল ৩৮২ কোটি টাকা, ইউএইচএসসিতে ১৩১৭টি কেন্দ্রের জন্য ৯৮ কোটি ও সিসির ১৩৫০৮টি কেন্দ্রের জন্য ১৬৫ কোটি টাকা। তিনি ২০২১-২২ সালের বিকল্প বাজেটে ইউএইচসিতে ৩ গুণ বাড়িয়ে ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার দাবি জানান। সেখানে বেশি লাগবে ৭৬৪ কোটি টাকা। ইউএইচএসসিতে ২৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে ১৯৫ কোটি টাকা বেশি ও সিসিতে ৪৯৪ কোটি টাকা বাড়ালে ৩২৯ কোটি টাকা বেশি লাগবে।
ড. আতিউর প্রস্তাব রাখেন বর্তমানে ইউএইচএসসিতে ৩৩ হাজার জনবল আছে অথচ সেখানে ঘাটতি আছে ১৬ হাজার। এদের শূন্যপদে নিয়োগ দিলে ৬৩৬৯ কোটি টাকা, ইউএইচএসসিতে বর্তমান জনবল ২৯ হাজার ও ঘাটতি ২৫ হাজার। আর এদেরকে নিয়োগ দিলে ৮০ হাজার কোটি টাকা ও সিসিতে বর্তমান জনবল ১২ হাজার ও ঘাটতি ১১০০ জন। তাতে ব্যয় বাড়বে ২৭ কোটি টাকা। এই তিনটি উপখাতে মোট ব্যয় হবে ৬ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা প্রয়োজন। ড. আতিউর বলেন, ২০১০-১১ হতে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য যে বাজেট দেয়া হয়েছে তার বিশাল অংশ অবাস্তবায়িত থাকছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে পরিচালন বাজেট দেয়া হয়েছিল তার তুলনায় প্রকৃত ব্যয় ৮৪ শতাংশ ও উন্নয়নে ৫১ শতাংশ।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের ৭-৮ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। এতে প্রাথমিকে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের অন্তত ৪৫ শতাংশ, ‘মেডিকেল ও সার্জিক্যাল সাপ্লাই’ উপখাতে ২৫ শতাংশ দিতে হবে। তাতে করে নাগরিকদের ওষুধ ও অন্যান্য পচনশীল চিকিৎসা সামগ্রী বাবদ ব্যয় কমবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, স্বাস্থ্যখাতে মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি বরাদ্দে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্ব নিম্নে অবস্থান করছে। এখানে শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ। সেখানে ১৫৭ মার্কিন ডলার, ভূটানে ১০৩, ভারতে ৭৩ ও নেপালে ৫৮ মার্কিন ডলার। অথচ বাংলাদেশে ৪৫ মার্কিন ডলার যা জিডিটির মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ এসব কারেন্ট হেলথ এক্সপেন্ডিচার-সিএইচই এর প্রতিবেদনের। তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ৫-৬শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অথচ দেশের ৪৩ শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়ে থাকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা ও শতাংশ হিসেবে ৫.২, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা ও শতাংশ হিসেবে ৪.৮, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৫৩২ ও শতাংশ হিসেবে ৪.২, ২০২০-২১ এর সংশোধিত বাজেটে ৩১ হাজার ৪৭২ ও শতাংশ হিসেবে ৫.৮ ও ২০২১-২২ প্রস্তাবিত বাজেটে ৩২৭৩১ কোটি টাকা ও শতাংশ হিসেবে ৫.৪।
ড. আতিউর বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে নাগরিকরা নিজের পকেট থেকে ৬৮ শতাংশ ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। সরকারি ব্যয় ২৩, উন্নয়ন সহযোগিদের ৫, ব্যক্তি ও নন-গভর্নমেন্ট ওর্গানাইজেশন-এনজিওখাতের ২ শতাংশ করে ৪ শতাংশসহ মোট ৩২ শতাংশ ব্যয় হয়। এই ব্যয়ের মধ্যে ওষুধ ও অন্যান্য পচনশীল চিকিৎসা সামগ্রিতে ৬৭ শতাংশ, আউটপেশেন্ট কিউরেটিভ সেবা ১৩ শতাংশ, ইনপেশেন্ট কিউরেটিভ সেবা ৮, ল্যাবরেটরিতে ৭ ও ইমেজিং সেবাতে ৫ শতাংশ ব্যয় হয়।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি মানুষ সেবা নিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যায়। অথচ এখানে বাজেট সবচেয়ে কম। প্রাইমারিতে ২৫, সেকেন্ডারিতে ৩৯ ও টারসিয়ারিতে ৩৬ শতাংশ ব্যয় হয়। এটি বৃদ্ধি করতে হবে।
এ সময় আসন্ন জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের ৭-৮ শতাংশ ও মধ্যমেয়াদে ১০-১২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেন ড. আতিউর। বলেন, প্রাথমিকে ৩০ শতাংশ ও মধ্যমেয়াদে ৩৫-৪০ শতাংশ করতে হবে। স্বাস্থ্য বাজেটের ২৫ শতাংশ চিকিৎসা ও শৈল্যচিকিৎসা সরঞ্জামাদিতে বরাদ্দ ও মধ্যমেয়াদে তা ৩৫-৪০ শতাংশ করতে হবে। এডিপিতে স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দ বাস্তবায়নের হার ৮০-৮৫ শতাংশ ও মধ্যমেয়াদে ৯০-৯৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, আগে ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন দুষ্টচক্র ছিল। ৭৫ শতাংশে ২৫ শতাংশ থেকে ওষুধ কিনে ইডিসিএল। আমাদের হেলথ সেক্টরে উন্নয়ন মেডিকেল কলেজ, যোগ্য পিডি পাওয়া যায় না। এখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দেয়া হয়। তাদের ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। মেডিকেল ক্যাডারে নতুন পদ সৃষ্টি করে তাকে পিডি তৈরিতে সহযোগিতা করা দরকার। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
ডা. হাবিব এ মিল্লাত এমপি বলেন, বাজেটের আয় কোথা থেকে আসবে তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে পরিমিতভাবে ব্যয় করতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য বাজেটের কলভর বাড়াতে হবে। কেননা ৫০ বছরে স্বাস্থ্যে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। ১৫ হাজার নার্স ও ২৫ হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মান-সম্মতসেবা নিশ্চিত করতে উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হবে।
রুমিন ফারহানা এমপি বলেন, সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যের বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে তাকালে দেখা যায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশের ৮৬ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার কারণে দারিদ্রসীমার নিচে চলে যায়। ২৪ শতাংশ মানুষের আয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ এ খাতে চলে যায়। তিনি বলেন, বরাদ্দ উন্নয়ন কাঠামোতে দিলে দুর্নীতি করতে সহজ হয়। আর এখানে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের কাছে সরকার কোণঠাসা। ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ব্যয় করতে পারেনি বলে ফিরে গেছে। ১০ মাসে ৩৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। মাত্র ১ মাসে ৬১ শতাংশ ব্যয় করতে হবে।
ডা. মোরশেদা চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাখাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। এখন আবার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, জেন্ডার সংবেদনশীলতা থাকতে হবে বাজেটে। এখানে নারী ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বাজেট হতে হবে।
শামীম হায়দার পাটোয়ারি এমপি বলেন, তিন বছরে সংসদে ১০০টি ভালো কথা হলেও একটি কাজ হয়নি। স্বাস্থ্য ক্যাডার ও নীতি হওয়া দরকার। স্বাস্থ্যখাতে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। বাজেটে এমপিদের অংশগ্রহণ নেই।
ডা. জাকির হোসেন বলেন, যারা বাজেট প্রণয়ন করেন তারা কি মানুষের কথা চিন্তা করে? ভারতে প্রতিবছর জরিপ করা হয় কি ধরনের বর্তমান সমস্যা আছে। সেটি চিহ্নিত করতে।
শিশির মোড়ল বলেন, জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কোন কথা হয় না। ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ অনেক সংসদ সদস্য বোঝেন না। এর কারণ হচ্ছে সংসদে আলোচনা হয় না। স্বাস্থ্যের খরচ কমাতে হলে ওষুধ থেকে কমাতে হবে। তিনি বলেন, অপারেশন প্লানে দুর্নীতি প্রচুর। কেননা এটি রাজনৈতিক ক্যাডার।
আনন্দবাজার/শহক









