সংবাদ বিশ্লেষণ---
- ইরাকের পর সবচেয়ে বড় অভিযান
- যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে হবে পরমাণুযুদ্ধ
- নীবর দর্শক হবে না যুক্তরাষ্ট্র
- যুদ্ধ থামাতে কি সক্ষম সম্মিলিত বিশ্বশক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা- যুদ্ধে জয়লাভের জন্য রাশিয়া পারমাণবিক হামলা পরিচালনার নীতি অবলম্বন করতে পারে। ফলে নতুন করে পরমাণুযুদ্ধের ঝুঁকি নেবে কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে
ইউক্রেন আগ্রাসনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে অন্ধকারতম সময়ের একটি বলে আখ্যায়িত করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চার কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। তবে আগ্রাসনের শুরু থেকেই রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চলছে। দ্বিতীয় দিনেই রাজধানীর সামরিক সদর দপ্তরে হামলার পর শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করেছেন বহু মানুষ। তবে হঠাৎ করে কেনই বা এমন টালমাটাল হয়ে উঠলো বিশ্ব- তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এতদিন ধরে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে এসেছে। রাশিয়ার এ হামলার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিযোগিতারই প্রতিফলন অনেকটা স্পষ্ট। এটা নতুন আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের দিকেই বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে। আর সেটা যদি পরমাণু সমৃদ্ধ বিশ্বশক্তিকে মুখোমুখি দাঁড় করায় তবে ইউরোপ তথা বিশ্বের জন্য এটি হবে একটি অন্ধকার যুগের সূচনা।
বিগত দুই দশকের মধ্যে এটাই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরি, ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়া ও ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যে হুমকি হয়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে ইউক্রেনে হামলার ধরনের বেশ মিল পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া পুতিনের পক্ষ থেকে রয়েছে পরোক্ষ পরমাণু চামলার হুমকি!
শক্তি দেখাতেই যুদ্ধ?
প্রায় দুশ বছর ধরে রাশিয়ার অংশ ছিল ক্রিমিয়া। ১৯৫৪ সালে সোভিয়েতি ইউনিয়ন ইউক্রেনের কাছে ক্রিমিয়া হস্তান্তর করেন। তখন রুশ নেতৃত্ব ভাবেনি যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হবে। ক্রিমিয়ার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। কৌশলগত কারণে রাশিয়ার কাছে ক্রিমিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সুযোগ পেয়ে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া ২০১৪ সালের মার্চে রাশিয়া দখল করে নেয়। ক্রিমিয়া দখল ছিল ১৯৪৫ সালের পর মস্কোর প্রথম সরাসরি রাজ্য বিস্তার। যা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় নতুন করে রুশভীতি সৃষ্টি করে।
ক্রিমিয়া রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ায়নি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপও কোনো সামরিক পদক্ষেপে যায়নি। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে চায় নি। ফলে শঙ্কা ছিল ভবিষ্যতে ক্রিমিয়ার মতো রাশিয়ার দখলে চলে যেতে পারে পূর্ব ইউক্রেন। এমনকি রাশিয়ার আশেপাশে আরও কিছু দুর্বল দেশের একই পরিণতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিলো।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধে পরাজিত আর বিধ্বস্ত রাশিয়াকে টানা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা পুতিন আবারও বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে টেনে তুলেছেন। আবারও প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরিয়ে এনেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা- ভবিষ্যতে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য রাশিয়া প্রথমে পারমাণবিক হামলা পরিচালনার নীতি অবলম্বন করতে পারে। ফলে নতুন করে পরমাণুযুদ্ধের ঝুঁকি নিবে কি না তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে আমেরিকাকে।
রাশিয়ার চাওয়া
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য নয় ইউক্রেন। তবে দেশটি ন্যাটোর সদস্য হতে চায়। বিষয়টি কিছুতেইা মানতে নারাজ রাশিয়া। এ কারণে রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে এমন নিশ্চয়তা চায় যে ইউক্রেনকে কখনো ন্যাটোর সদস্য করা হবে না। রাশিয়ার চাওয়া অনুযায়ী, এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা দিতে রাজি নয় পশ্চিমা দেশগুলো।
পুতিন মনে করেন, রাশিয়াকে চারদিক থেকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলো ন্যাটোকে ব্যবহার করছে। ইউক্রেনকেও এ উদ্দেশ্যে ন্যাটোতে নেওয়া হতে পারে। এ কারণে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছেন তিনি। রাশিয়ার অভিযোগ, গত শতকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে পূর্ব দিকে সম্প্রসারণ করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি।
রাশিয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে অন্তর্ভুক্ত না করার যে দাবি মস্কো জানাচ্ছে, তা নাকচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ন্যাটো বলছে, এটি একটি আত্মরক্ষামূলক সামরিক জোট। প্রতিটি দেশের প্রতিরক্ষার পথ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।
রাশিয়ার চিন্তা
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এ ভাঙনকে রাশিয়ার জন্য একটি ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় বলে মনে করেন পুতিন। তারপর থেকে রাশিয়া দেখছে, সামরিক জোট ন্যাটো ধীরে ধীরে তাদের ঘিরে ফেলছে। সংগত কারণেই রাশিয়া তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৯৯ সালে চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেয়। ২০০৪ সালে যোগ দেয় বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া ও স্লোভাকিয়া। ২০০৯ সালে যোগ দেয় আলবেনিয়া।
জর্জিয়া, মলদোভা বা ইউক্রেনেরও ন্যাটোতে যোগ দেওয়া আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু রাশিয়ার কারণে এখন পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। তবে এই তিন দেশে রুশপন্থী বিদ্রোহী আছে। এই দেশগুলোর কোনোটি যদি ন্যাটোতে যোগ দেয়, তবে তা রাশিয়ার জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে।
ন্যাটোর অবস্থান
প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, ইউক্রেন প্রশ্নে পশ্চিমা নেতারা ঐক্যবদ্ধ। তবে ইউক্রেনের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের সমর্থন-সহযোগিতায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। তবে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন করা হবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
ইউক্রেনকে স্বল্পমাত্রার ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার কথা বলেছে যুক্তরাজ্য। ডেনমার্ক, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসের মতো ন্যাটো দেশ পূর্ব ইউরোপে প্রতিরক্ষা জোরালো করেছে। ইউক্রেনের অনুরোধ সত্ত্বেও দেশটিকে কোনো অস্ত্র দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে জার্মানি।
পারমাণবিক হুমকি
এরইমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে কেউ নাক গলালে ‘এমন পরিণতি হবে যা ইতিহাসে কেউ কখনো সম্মুখীন হননি’। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-ইভেস লে ড্রিয়ান বলেন, পুতিন যখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছেন তখন এটা বুঝতে হবে যে, ন্যাটোও একটি পারমাণবিক জোট।
অন্যদিকে দেশ দখল হতে দেখা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, আজ সকালেও আমরা একা দেশরক্ষায় লড়ছি। গতকালের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীগুলো দূর থেকে শুধু দেখছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘গতকালের নিষেধাজ্ঞায় কি রাশিয়ার ওপর কোনো প্রভাব পড়েছে? আমরা আকাশে যে শব্দ শুনছি ও যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলগ বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন থামাতে বাইডেনের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এমনকি ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার এ ব্যাপক আগ্রাসন থামাতে জো বাইডেন বেশি কিছু করতেও পারবেন না। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক এ লেফটেন্যান্ট জেনারেল।
এসব হামলার বিষয়ে ন্যাটোর ভূমিকাও স্পষ্ট করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। তিনি জানিয়ে দেন, হামলাগুলোতে শুধু নীরব দর্শক হয়ে রইবে না যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে একেবারে দৃঢ় অবস্থানে আছেন যে ন্যাটোর আওতাভুক্ত প্রতিটি এলাকা রক্ষা করা হবে। ইউক্রেন হামলার পর সবচেয়ে কঠোর প্রতিরোধ এখান থেকেই হবে।
আসন্ন সংকট
এই মুহূর্তে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো শরণার্থী সংকট। কারণ হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন থেকে লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য প্রস্তুতিও নেওয়া শুর করেছে ইউরোপের দেশগুলো। তবে শরণার্থী নিয়ে ইউরোপের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। কারণ পূর্ণমাত্রার হামলায় শরণার্থীর ঢল নামতে পারে। যা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে কখনো দেখা যায়নি। পাশাপাশি মানবিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি হতে পারে।
ইউক্রেনে হামলার কারণে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিকভাবে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসছে। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণায় শামিল হচ্ছে নতুন নতুন দেশ। তবে ইতিহাসে বলে, রাশিয়ার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের থামানো যায় না। সেটা যত বড় নিষেধাজ্ঞাই হোক। যখন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আসে, তখন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমলে নেয় না শক্তিধর দেশগুলো। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামাতে বা জড়াতে গেলে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ফলে পুরো বিশ্ব চাইলেও কি যুদ্ধ থামাতে পারবে সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে হয়ে দেখা দিয়েছে।
তাছাড়া আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও সোমালিয়া আগ্রাসন ও ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশে অমানবিক অবরোধ দেয়া যুক্তরাষ্ট্রর কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়র নৈতিক অধিকার আছে? সেই প্রশ্নও ওঠে আসছে।









