- জিডিপিতে চীন-ভারতকে টপকে গেছে বাংলাদেশ
- স্বপ্ন ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫তম অর্থনৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া
‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ অপবাদ থেকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। পরিণত হচ্ছে বিনিয়োগের মহাসাগরে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্থনীতির পরিসর বেড়েছে বহুগুণ। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নীত হয়েছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উঠার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে শুধু অবকাঠামো খাতেই দেশের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার। ইতোমধ্যে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১১ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫ হাজার কোটি টাকায়।
পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্প বিপ্লব, সস্তা শ্রমসহ অন্যান্য বহুমুখী সুবিধার কারণে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন দিন দিন বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথে এগিয়ে যাওয়া এ দেশটিতে প্রযুক্তিভিত্তিক টেকসই শিল্প স্থাপনেও বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ এখানে বিনিয়োগ করার জন্য ইতোমধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে। আরো বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলোপমেন্ট অথরিটির (বিডা)। গত ২৮ ও ২৯ নভেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২১। যেখান থেকে বিদেশি বিনিয়োগের অভুতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে।
শুধু অবকাঠামোই নয় জ্বালানি, বিদ্যুৎ, অর্থনৈতিক অঞ্চল, চামড়া, গার্মেন্ট, যোগাযোগসহ ১১টি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বহু দেশ থেকে আসা বিনিয়োগকারীরা। তারা বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাবের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চুক্তি হয়েছে দুই দশমিক সাত ডলার তথা প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার। বিদেশি এই বিনিয়োগে প্রথম সারিতে রয়েছে সৌদি আরব, জাপান, তুরস্ক ও চীন।
সম্মেলন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এশিয়ার জনসংখ্যাসমৃদ্ধ দেশ চীন ও ভারতের পর জায়গা অনুপাতে বাংলাদেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক কর্মশক্তি ও মানবসম্পদ। মানুষকে উপলক্ষ্য করেই যেহেতু বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়, সেক্ষেত্রে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ অধ্যুষিত পলি মাটি বিধৌত ব-দ্বীপটি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনায় ভাসছে। আমাদের দেশের মাটি যে সোনার চেয়েও খাটি তা শুধু গানে গানেই নয় এখন হাতে কলমে প্রমাণিত। একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনা দেশটি তখন ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত। বলা যায়, সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার তখন বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই তলাবিহনী বাংলাদেশই গেল ৫০ বছরে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সস্তা শ্রমবাজার, উর্বর জমি, উন্নত যোগাযোগের পাশাপাশি সরকারের নানা ধরনের ভ্যাট, ট্যাক্সের ছাড়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়েছে দেশে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেমন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন, তেমনি তাদের বিনিয়োগের লভ্যাংশ নিজে দেশে সহজেই নিয়ে যাওয়ার মতো সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামীর এশিয়ান টাইগারখ্যাত বাংলাদেশ বিদেশিদের কাছে হাত পাতার বদলে এখন নানামুখী সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে জাপান, চীন, ভারত, সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বিশ্বের বহু দেশ থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
আঠারো শতকে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব যে ভারতীয় উপহাদেশ তথা ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের শোষিত অর্থে হয়েছিল সেটির প্রমাণ এখন ভুরি ভুরি। পনের শতকে দিল্লির সুলতানদের আমলে ভারতের মোট দেশীয় উৎপাদন বা জিডিপি ৬০ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ শতাংশে। যার সিংহভাগ অর্থই বঙ্গ তথা বাংলাদেশের। প্রাচীনকাল থেকেই বর্গি, গুপ্ত, সেন, ইরানি, তুর্কি, মোঘল, পর্তুগিজ, ডাচ ও ইংরেজদের লুটপাট, শোষণ ও পাকিস্তানের জ্বালাও পোড়াও এর কবলে থাকা বাংলাদেশ এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী ও দেশকে শিল্পায়নে সমৃদ্ধ করতে বদ্ধ পরিকর।
চীনের পর্যটক মা হুয়ান বলেছিলেন, সমুদ্র বাণিজ্যে বঙ্গভূমির (বাংলাদেশ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ইউরোপীয় পর্যটক, ভারথিমা, বারসায়ী ও টম পেরেসও মালাক্কায় বিপুলসংখ্যক ধনী বাঙালিকে ব্যবসায়ী ও জাহাজের মালিক হিসেবে ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করতে দেখেছেন। ২০১৫ সালে প্রায় বাংলাদেশের সমান সমুদ্রসীমার বিজয় খুলে দিয়েছে আমাদের নীল অর্থনীতির দুয়ার। সমুদ্রে নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই ভীতু বাঙালিরা আবারও ব্যবসায়-বাণিজ্যে পাল তুলেছেন। অর্থনীতির তীব্র স্রোতে ক্ষীপ্রগতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন বিদেশিদের।
আনন্দবাজার/শহক









