ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির চাষ প্রকল্পের যাত্রা শুরু করে রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০৪ সালে ৭৪টি প্রাপ্তবয়স্ক কুমির নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ খামারে বর্তমানে ছোট বড় কুমির রয়েছে সাড়ে তিন হাজার।
প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হিমায়িত কুমির পাঠানোর মধ্যদিয়ে তাদের রফতানি কার্যক্রম শুরু করে। গত চার বছরে এ প্রকল্প থেকে ১২৫৬টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয়েছে। জার্মানির হাইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একলাখ ডলারে ৬৯টি হিমায়িত কুমির রফতানি করা হয়। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কুমিরের চামড়ার বাজার দর কমেছে।
বর্তমানে রফতানিযোগ্য প্রায় ৫০০ কুমির ও আরো ৫০০ কুমিরের চামড়া থাকলেও করোনার কারণে তা রফতানি করা সম্ভব হচ্ছেনা। গত দুইবছর এখান থেকে কোনো কুমির রফতানি হয়নি। এতে প্রকল্পটিতে বর্তমানে কিছুটা আর্থিক অচলাবস্থা চলছে। সম্ভাবনাময় এ প্রকল্পটি টিকিয়ে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন প্রকল্পের কর্মরতরা।
উদ্যোক্তারা জানান, প্রতিবছর এ খামার থেকে এক হাজার কুমিরের চামড়া রফতানি করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এ ফার্ম থেকেই কুমিরের মাংস, চামড়া, দাঁত ও হাড় রফতানি করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। খামার কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চামড়া রফতানির একটি বড় বাজার জাপান। জাপানের বর্তমান বাজারে প্রতিবর্গফুট চামড়া রফতানি হয় প্রায় ১২ ডলারে। একটি কুমির থেকে ৪৫ থেকে ৫০ ফুট চামড়া পাওয়া যায়। সে হিসেবে একটি কুমিরের চামড়া প্রকারভেদে ৪ থেকে ৬শ’ ডলারে বিক্রি করা হয়। গত চার বছরের কুমির রফতানি থেকে প্রকল্পটি আয় করেছে ৬ কোটি টাকার উপরে। বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি ও প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ জটিলতা না থাকলে গত ১৯-২০ অর্থবছরে প্রকল্প থেকে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হতো।
খামার সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে মোস্তাক আহমেদ ও মেজবাউল হকসহ কয়েকজন উদ্যোক্তা কুমির চাষ প্রকল্পটি হাতে নেয়। নাম দেয়া হয় রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড। উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে প্রায় ১৪ একর জমির উপর গড়ে তোলা হয় প্রকল্পটি। এরমধ্যে ৪ একর জমির মাটি কেটে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় ১৪টি পুকুর। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৪ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন লাভের পর আন্তর্জাতিক সংস্থা সিআইটিইএসের অনুমোদন সাপেক্ষে ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার সারওয়াত থেকে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে আনা হয় ৭৫টি কুমির। কুমিরগুলো পরিবহনের সময় একটি কুমির মারা যায়। তখন কুমিরগুলোর বয়স ছিল ১০ থেকে ১৪ বছর। লম্বায় ছিল ৭ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ১২ ফুট। আমদানিকৃত কুমিরের মধ্যে ১৫টি ছিল পুরুষ। বর্তমানে এ খামারে কুমিরের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।
খামারের ব্যবস্থাপক ডা. আবু সাইম মোহাম্মদ আরিফ জানান, ২০২০ সালে রফতানিযোগ্য প্রায় ৫০০ কুমিরের চামড়া থাকলেও করোনার কারণে তা রফতানি করা সম্ভব হয়নি। করোনাকালীন চামড়ার বাজারমূল্য অনেকটা কমে গিয়েছিল। যে কারণে গেল বছরও আমরা কুমিরের চামড়া রফতানি করতে পারিনি। এ মূহুর্তে আমরা বিভিন্ন কারণে একটি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে আছি। পর পর দুই বছর রফতানি না হওয়ায় আমাদের কিছু আর্থিক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় আয় থেকেই কর্মচারিদের বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশাবাদি এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে খুব শিগগিরই একটি ভালো একটি অবস্থায় আসতে পারব। আশাকরি সরকার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করলে সম্ভবনাময় এ প্রকল্পটি টেকানো সম্ভব হবে।
ডা. আরিফ আরো জানান, কুমিরের প্রজনন মৌসুম এপ্রিল মে মাস অর্থাৎ বর্ষাকালে। প্রজননের একসপ্তাহের মধ্যে ডিম দেয়। প্রাপ্তবয়স্ক একটি কুমির গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি ডিম দেয়। ডিমসংগ্রহ করে রাখা হয় আন্তর্জাতিক মানের ইনকিউবেটরে। কারণ বাচ্চা ফুটানোর জন্য আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে ৮০ থেকে ৮৫ দিন। ডিম ফুটে কি কুমির জন্ম হবে তা নির্ভর করে তাপমাত্রার উপর। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি বেশি হলে পুরুষ বাচ্চা হওয়ার সম্ভবনাই বেশি। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর কিছুদিন ছোট ছোট হাউসে রাখা হয়। যেগুলোকে ধাপে ধাপে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে হ্যাচারিতে স্থানান্তর করা হয়। কয়েক মাস পরিচর্যা করার পর বাচ্চাদের পৃথক পৃথক পুকুরে স্থানান্তর করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যায় ৩ থেকে ৪ বছরেই চামড়া সংগ্রহ করার উপযুক্ত হয়। কুমিরের রোগবালাই নেই বললেই চলে। কুমিরের ছোট বাচ্চাদের প্রতিদিন খাবার দিতে হয়। বাচ্চাদের খাবার হিসেবে দেয়া হয় মাংসের কিমা। আর বড় কুমিরদের খাবার দেয়া হয় সপ্তাহে একদিন। মুরগির মাংসের পাশাপাশি গরুর মাংস ও মাছ দেয়া হয় খাবার হিসেবে।
খামার ব্যবস্থাপক আরিফ আরও বলেন, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় তিন থেকে চারশ কুমিরের চামড়া বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। গত চার বছরে আমরা মোট ১২শ ৫৬টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করেছি। আশাকরি আগামী বছর এখান থেকে প্রতিবছর এক হাজার কুমিরের চামড়া রফতানি করা সম্ভব হবে। এক একটি কুমিরের চামড়া প্রকারভেদে ৪ থেকে ৬শ ডলারে বিক্রি করা হয়। চামড়ার দরনির্ভর করে আকৃতি ও গুণগত মানের উপর। সরকারের অনুমতি পেলে দেশ বিদেশের ফাইভস্টার হোটেলে কুমিরের মাংস বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তাছাড়া কুমিরের দাঁত, হাড়সহ অন্যান্য অংশ বিদেশে রফতানি করারও পরিকল্পনা রয়েছে খামার কর্তৃপক্ষের।
খামার ব্যবস্থাপক আরও বলেন, আমাদের এ খামারে কুমিরের উৎপাদন প্রতিবছর বাড়ছে। ৭৪টি প্রাপ্ত বয়স্ক কুমির নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ ফার্মে বর্তমানে ছোট বড় কুমির রয়েছে সাড়ে তিন হাজার। স্ত্রী কুমিরের তুলনায় পুরুষ কুমির দ্রুত বাড়ে। তাই পুরুষ কুমিরের উৎপাদন বাড়ানো চেষ্টা করা হচ্ছে। খামারে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৬০ জন কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। কুমির চাষের কারণে ‘হাতিবেড়’ গ্রামটি ‘কুমিরের গ্রাম’ নামে পরিচিত করেছে।
আনন্দবাজার/শহক









